সৎসঙ্ঘের অনন্য উদাহরণ কোয়ান্টাম

কোয়ান্টাম মেথডের তৃতীয় ব্যাচে অংশগ্রহণ করে আমি আমার জীবনের সংগ্রামী অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করেছি কোয়ান্টামের ইতিবাচক চিন্তার আলোকে। ১৯৯০ সালে বাথরুম পরিষ্কার করতে গিয়ে পায়ের আঙুলে ঝাড়ুর শলা বিঁধে ধনুষ্টংকার হয়ে গেল। কোমাতে ছিলাম ৪০ দিন। ডাক্তাররা পরিবারের সদস্যদের বলে দিলেন, যেকোনো দিন লাশ গ্রহণের জন্যে মানসিক প্রস্তুতি নিতে, কারণ ব্রেনে টক্সিন চলে গিয়েছিলো। একদিকে বাকরুদ্ধ অচেতন অবস্থা, অন্যদিকে হাত-পা বাঁকা হয়ে যাওয়ায় আমাকে নাকি খাটের সাথে বেঁধে রাখতে হতো। অবশ্য সে সময়কার কোনো কিছুই আমার মনে নেই। ৪০ দিন পর ঘটলো এক অদ্ভুত ঘটনা যা ডাক্তারদেরও বিস্মিত করেছে। সেদিন ছিলো জাতীয় যুব দিবস। রেডিওতে ঘোষণা হচ্ছে, সে মুহূর্তে আমি শোয়া থেকে একেবারে দাঁড়িয়ে গেলাম। এরপর ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলাম। ডাক্তাররা আশঙ্কা করেছিলেন আমি পঙ্গু হয়ে যাবো বা আমার স্মৃতিশক্তি পুরোপুরি লোপ পাবে। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হওয়ায় মনে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস এলো। ৯/১০ দিন পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়া শুরু করলাম। রোকেয়া হলের হাউজ টিউটর থাকাকালীন ২০ বছর আগে যে ছাত্রীকে চিনতাম তার নাম, এমনকি রুম নাম্বার অনায়াসে মনে করতে পারলাম।
ছাত্রী হিসেবে ভারতীয় দর্শন পড়েছি, শিক্ষক হিসেবেও ৩৯ বছর ধরে ছাত্র-ছাত্রীদের ভারতীয় দর্শন পড়াচ্ছি। সব দর্শনেই ধ্যানকে জাগতিক মোহ-দুঃখ-মানসিক চাপ ক্ষুদ্র স্বার্থপরতা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে বলা হয়েছে। ধ্যানের প্রতি তাই সবসময়ই আকর্ষণ অনুভব করতাম। কিন্তু এতদিনের আমার যা জানা তা ছিলো তাত্ত্বিক। প্রথমবারের মতো ধ্যানের বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো কোয়ান্টাম মেথড কোর্সে এসে। এত গভীরভাবে আত্মমগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম যে, প্রশিক্ষককে এসে আমাকে ডেকে তুলতে হয়েছিলো।
১৯৯৩ এর শেষের দিকে এলো আরেক সংকট। আমার ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়লো। অপারেশন হলো। রেডিও থেরাপি, ওরাল থেরাপি এবং ওষুধ চলতে লাগলো। সেই সাথে চলতে লাগলো অক্লান্ত কাজ। মাস দেড়েকের জন্যে দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যেতে হয়েছিলো। ফাঁকে ফাঁকে সেই হাসপাতালের ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের আর্থ-সামাজিক সংকট নিয়ে একটি উপন্যাসও লিখে ফেললাম। তারপর দেশে ফিরেই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কনসালট্যান্ট হিসেবে ঘুরে বেড়িয়েছি আড়াইশটি উপজেলায়, কাজ করেছি প্রায় পাঁচশো যুব সংগঠনের সাথে। ক্যান্সারকে বহন করেও আমি তখন আমার জীবনের ব্যস্ততম সময় কাটাতে পেরেছি।
ছোটবেলায় নানা বলতেন - আলস্যকে প্রশ্রয় দিলে সারাজীবন তার পরিতাপে যায়। ‘আলস্য বিষম্ভুৎ স্কন্ধে যার চাপে, সারা জীবন তার যায় পরিতাপে।’ নানীকে দেখেছি বৃদ্ধ বয়সেও পাড়া-প্রতিবেশীদের আপদে-বিপদে এগিয়ে যেতে। এ সবই আমাকে অক্লান্তভাবে মানুষের সেবায় কাজ করার প্রেরণা যুগিয়েছে। আসলে ইচ্ছে থাকলে যেকোনো আপাত অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। এজন্যে বয়স কোনো বাধা নয়। যে কারণে প্রফেসর হয়ে যাওয়ার পরও ৫৯ বছর বয়সে আমি পিএইচডি সম্পন্ন করতে পেরেছি। দার্শনিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ বিষয়ে আমার এ গবেষণা করতে গিয়ে এমন কিছু ধারণা লাভ করেছি যা আমাকে সৎসঙ্ঘ হিসেবে ফাউন্ডেশন এবং এর নেতৃত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবিয়েছে।
আমার থিসিসে আমি নেতৃত্বের তিনটি বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরেছি। প্রথমত, কমিটমেন্ট অর্থাৎ চেতনার প্রতি বিশ্বাস। দ্বিতীয়ত, ক্যাপাসিটি অর্থাৎ চেতনাকে বিকশিত করার সামর্থ্য এবং তৃতীয়ত, কমিউনিকেশন অর্থাৎ চেতনাকে বিস্তৃত করার জন্যে কার্যকর জনসংযোগ। এই তিনটি ক্ষেত্রেই ফাউন্ডেশন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
যুব সংগঠনগুলোর সদস্যদের প্রশিক্ষণ-তদারকির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষিত থেকে শুরু করে গ্রামের অশিক্ষিত তরুণরা সবাই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে চায়। একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে তরুণরা উপকরণের স্বল্পতা নিয়ে সঙ্ঘবদ্ধভাবে কাজে নেমে তাদের ও আশেপাশের মানুষের জন্যে অন্তত কিছু ভালো কাজ হলেও করছে। আসলে আমাদের প্রাকৃতিক বা মানব সম্পদের কোনো অভাব নেই। অভাব শুধু এগুলো সঠিক পথে কাজে লাগানোর প্রক্রিয়ার এবং যারা তা পরিচালনা করবেন তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের।
আসলে এখন যুব সমাজের এক ক্রান্তিলগ্ন চলছে। তারা যে পরিবারে থাকে সেখানে হয়তো কোনো মূল্যবোধই নেই অথবা থাকলেও সে যখন বাইরের পরিবেশে আসছে তখন বিপরীত মূল্যবোধ দেখে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ছে। ইদানিং এর সাথে যুক্ত হয়েছে টিভি, মোবাইল ফোন এবং মাদকের হাতছানি। সব মিলিয়ে চারদিকে অবক্ষয়ের এত উপকরণের ক্ষতি থেকে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচানোর জন্যে ফাউন্ডেশন কাজ করছে। যে তরুণ বা তরুণী হতাশা ও হীনম্মন্যতায় তার সম্ভাবনাগুলো নষ্ট করছিলো, কোয়ান্টামে এসে তারা নিজেদেরকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছে। এখন তারাই আবার হাজারো তরুণকে আলোর পথ দেখাচ্ছে।
বিশ্বজনীন মমতা আর দায়িত্ববোধ নিয়ে কোয়ান্টামের এই কাউন্সেলিং সেবা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ফাউন্ডেশন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে রক্তদান, নিরক্ষরতা দূর, সেবা দান ইত্যাদি মহতী কাজে।
তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার যে কাজ একসময় আদর্শ শিক্ষকরা করতেন, সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনে নিঃস্বার্থ নেতারা করতেন আজকে সে কাজটিই করছে কোয়ান্টাম। তাই এই সৎসঙ্ঘের পথযাত্রায় দিনকে দিন অগণিত মানুষ জড়ো হচ্ছেন, নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সুন্দর আগামীর পথে।
কোয়ান্টামে এসেই আমার আজন্ম লালিত আশাবাদ আর প্রতিকূলতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়ার লড়াকু মনোভাব শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। ১৯ বছর ধরে তাই যখনই ফুরসত পেয়েছি কিছুক্ষণের জন্যে মেডিটেশন করে শরীরটাকে ঝরঝরে করে নিয়েছি, মনকে প্রাণবন্ত করেছি।