স্বপ্নের লক্ষ্যে আমরা পৌঁছবোই

Bangla
এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর সেনানী। মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চীফ অব স্টাফ হিসেবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্

১৯৭১ সালে আমি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে ঢাকায় কর্মরত ছিলাম। ঢাকায় এয়ারফোর্সের বাঙালিদের মধ্যে আমিই ছিলাম সিনিয়র মোস্ট অফিসার। ২৫ মার্চ রাতে ঘটে গেছে ইতিহাসের বর্বরতম সেই হত্যাকাণ্ড যখন পাকিস্তানি বাহিনী রাতের আঁধারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালির ওপর। গুলি করে মেরেছিলো হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে। এত আগুন জ্বলেছিলো সে রাতে যে, রাতের আকাশও আগুনের আঁচে টকটকে লাল হয়ে গিয়েছিলো। আর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিলাসবহুল রুমের জানালা দিয়ে সেই হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছিলেন পাকিস্তানের কুখ্যাত রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টো। সকালবেলা পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় তার প্রতিক্রিয়া তিনি জানান এভাবে- "Thank God, Pakistan has been saved" অর্থাৎ এখনকার বাংলাদেশ- সে সময় যাকে পূর্ব পাকিস্তান বলা হতো, তাকে তিনি পাকিস্তান বলে মনে করেন না এবং তার ক্ষতি নিয়েও তিনি বিচলিত নন- এ মনোভাবই বোধ করি ফুটে উঠেছে এ মন্তব্যে।

মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি আরো কয়েকজন ফাইটার পাইলটের সাথে যোগাযোগ করলাম। সব মিলিয়ে ১০ জন পাইলট তাদের পরিবার নিয়ে দুটো ভাগে ভাগ হয়ে সীমান্ত অতিক্রমের জন্যে এগুতে লাগলাম। একটি দল আগরতলায় পৌঁছে গেল। আমাদের দলটি সন্ধ্যে নাগাদ পৌঁছলো সীমান্তের একদম কাছে শিবের বাজার নামে একটি গ্রামে। সারাদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে হেঁটে আমরা সবাই ভীষণভাবে ভিজে গিয়েছিলাম, পথের ক্লান্তি আর ক্ষুধা তো ছিলোই। গ্রামের বাজারে একজনের কাছে আশ্রয় চাইতেই সে আমাদেরকে একজন কৃষকের সাথে যেতে বললো। আমরা গেলাম। একটা কুঁড়ে ঘরে খড়ের বিছানা পেতে আমাদের সবাইকে ঘুমুতে দেয়া হলো। হঠাৎ রাত আড়াইটার দিকে শুনি দরজা ধাক্কানোর শব্দ। সঙ্গী পাইলটরা সাথে সাথে অস্ত্র হাতে অবস্থান নিয়ে ফেললো। কিন্তু দরজা খুলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম- যখন দেখলাম কৃষক এবং তার স্ত্রীর হাতে আমাদের জন্যে গরম ভাত এবং মুরগির মাংসের তরকারি। দরিদ্র এ কৃষক তার ঘরের যৎসামান্য চাল এবং পালা মুরগি জবাই করে এই রাত আড়াইটায় রান্না করে নিয়ে এসেছে আমাদের জন্যে। নিষ্ঠুরতা দেখতে দেখতে পাথর হয়ে ওঠা আমার এ মন সেদিন আপ্লুত হয়ে পড়লো এক দরিদ্র কৃষকের মানবিকতার দৃষ্টান্ত দেখে। যুদ্ধ শেষে পুরো গ্রাম আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া সেই খাঁ খাঁ শিববাড়িতে গিয়ে অনেক খুঁজেও তাকে আর পাই নি।

সেসময় পাকিস্তানি বাহিনী ছিলো অত্যন্ত সুসজ্জিত, সুপ্রশিক্ষিত আধুনিক অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত ৯৩ হাজার সেনাদলের একটি সুসংগঠিত বাহিনী। আর এদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে যারা, সেই মুক্তিবাহিনী ছিলো যুদ্ধ সম্পর্কে কোনোরকম পূর্ব অভিজ্ঞতাবিহীন নামমাত্র প্রশিক্ষণে তৈরি একটি বাহিনী, যাদের রসদ বলতে গেলে কিছুই নেই। ১৯৭১-এর আগস্টে একবার মুক্তিযোদ্ধাদের একটা ক্যাম্প পরিদর্শনে গেলাম। একটা শতচ্ছিন্ন ত্রিপলের নিচে গাদাগাদি করে তিনশ মুক্তিযোদ্ধার থাকার ব্যবস্থা। এদের কেউ ছাত্র, কেউ কৃষক, কেউ ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। রাতে যখন গেলাম তখন তারা ঠান্ডা ভাত আর ডাল দিয়ে খাবার খাচ্ছিলো। ধরেই নিলাম যে, এখন এদের কাছ থেকে থাকা-খাওয়া নিয়ে নানারকম অভিযোগের কথা শুনতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার, একটি মানুষও সেদিন উঠে দাঁড়ায় নি থাকা-খাওয়ার কোনো অভিযোগের কথা বলার জন্যে। বরং তাদের সবার একটিই জিজ্ঞাসা ছিলো কবে নাগাদ তারা আরো অস্ত্রশস্ত্র পাবে।

প্রশিক্ষণের জন্যে বা যুদ্ধের জন্যে সেপ্টম্বর পর্যন্ত আমাদের বিমানবাহিনীর কোনো বিমান ছিলো না। সেপ্টম্বরে ভারতীয় বাহিনীর কাছ থেকে আমরা তিনটি বিমান পেলাম। আমাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হলো ভারতের নাগাল্যান্ডের পরিত্যক্ত একটি বিমান ঘাঁটি বীমাপুরে। যে তিনটি জঙ্গি বিমান আমরা পেয়েছিলাম তা এতই সাধারণ মানের জঙ্গি বিমান যে, আমাদের একমাত্র রণকৌশল হলো রাতের বেলায় আক্রমণ করা এবং বৃক্ষের উচ্চতায় ওড়া যাতে রাডারে ধরা না পড়ে। কিন্তু নাগাল্যান্ডের মতো গাছপালা আচ্ছন্ন পাহাড়ি এলাকায় এই প্রশিক্ষণ যে কতটা দুঃসাধ্য সেটা একজন অভিজ্ঞ পাইলট হিসেবে আমি জানি। একটা পাহাড়ের চূড়ায় গাছ কেটে সেখানে সাদা প্যারাসুট ফেলে তৈরি করা হলো প্রশিক্ষণ টার্গেট। সে এলাকায় গাছের একটু ওপর দিয়েই ভেসে বেড়াতো পুরু মেঘের আস্তরণ। গাছ এবং মেঘের স্তরের সেই সামান্য ব্যবধানে জঙ্গি বিমান নিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়া এতটাই কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ যে সাধারণ অবস্থায় এটা চিন্তাই করা যায় না। কিন্তু আমাদের নিবেদিতপ্রাণ একদল তরুণ পাইলট সেই অসম্ভবকেও সম্ভব করেছে। ফাইটার প্লেন নিয়ে নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রামে তারা যে সফল অপারেশন চালিয়েছে তা এ যুদ্ধে বিজয়ের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কারণ তারা পাকিস্তানি বাহিনীর জ্বালানি তেলের ডিপোতে আক্রমণ করে তা জ্বালিয়ে দিয়েছিলো। ফলে জ্বালানি সরবরাহে দারুণ ঘাটতিতে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী।

১৯৭১ সালের ৩ পাকিস্তান পশ্চিম ভারতের কয়েকটি ঘাঁটি আক্রমণ করে আর এর মাধ্যমেই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু মুক্তিবাহিনী আক্রমণের পর আক্রমণ করে পাকিস্তানি বাহিনীকে শারীরিক-মানসিকভাবে এতটাই দুর্বল করে ফেলেছিলো যে, মাত্র ৬ দিন পরেই ৯ তারিখে তারা আত্মসমর্পণের জন্যে প্রস্তাব দিলো। অবশ্য এরপরও নানারকম কূটনৈতিক জটিলতার কারণে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ হয় ১৬ ডিসেম্বর| আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চীফ অব স্টাফ হিসেবে আমি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করি। জিপে করে যখন রমনা রেসকোর্স ময়দানে যাচ্ছিলাম তখন রাস্তার দুপাশে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে হর্ষধ্বনি করছিলো। তাদের চোখে-মুখে ছিলো স্বপ্ন স্বধীনতার মধ্য দিয়ে যে স্বপ্নের দরজা তাদের সামনে খুলে গেছে বলে তারা মনে করেছিলো। সেসময়ে পৃথিবীর আধুনিকতম একটি সমরবাহিনীর বিরুদ্ধে নামমাত্র প্রশিক্ষণ এবং রসদ নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিলো যে বাহিনী তাদের কতটা সাহস, মনোবল এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা থাকলে মাত্র ৯ মাসেই আত্মসমর্পণে বাধ্য করানো যায়, তা সহজেই বোঝা যায়। কারণ পুরো জাতি সে যুদ্ধে নেমেছিলো এবং জয়ের ব্যাপারে ছিলো আপসহীন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে যে স্বপ্ন ঝলসে উঠেছিলো সেদিনের চেহারাগুলোয় সে স্বপ্ন হয়তো সাময়িকভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি এ আত্মত্যাগ, এ শ্রম বৃথা যেতে পারে না। সে স্বপ্নের লক্ষ্যে আমরা পৌঁছবোই।