সুস্থ জীবনধারা ও মেডিটেশন হৃদরোগ প্রতিরোধ করতে পারে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন আমি স্কুলে পড়ি। এ যুদ্ধে জার্মানি, ইটালি এবং জাপান একপক্ষে ছিলো যাদেরকে বলা হতো অক্ষশক্তি। আর ইংল্যান্ড, রাশিয়া এবং আমেরিকা ছিলো আরেক পক্ষে যাদেরকে বলা হতো মিত্রশক্তি। বৃটেন ছাড়া ইউরোপের প্রায় পুরোটাই আর এদিকে বার্মা পর্যন্ত একের পর এক যখন অক্ষশক্তির দখলে চলে আসছে, মনে হচ্ছে যুদ্ধে বোধ হয় তারাই জিতে যাবে। একদিন আমাদের এক স্যার জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কী মনে হয়? কে জিতবে এ যুদ্ধে? আমরা সমস্বরে বললাম, জার্মানি জিতবে। কারণ জার্মানি তখন একের পর এক যুদ্ধ জিতছে। কিন্তু স্যার বললেন- না, জার্মানি জিতবে না। কারণ একদিন তাদের সব সম্পদ শেষ হয়ে যাবে। সমস্ত পৃথিবীর সঙ্গে তারা পারবে না। স্যারের কথাই ঠিক হয়েছিলো।
হিটলার আসলে একজন ইভিল জিনিয়াস ছিলো। তার যে মেধা ছিলো তা ভালো কাজে লাগালে পৃথিবীর অনেক উপকার হতো। যেমন, একটা ছুরি দিয়ে অপারেশন করে জীবন বাঁচানো যায়। আবার এ ছুরি দিয়ে মানুষও খুন করা যায়। নির্ভর করে কে কীভাবে ব্যবহার করবে তার ওপর।
সুস্বাস্থ্যের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। স্রষ্টা এক অসাধারণ কর্মক্ষমতাময় স্বয়ংসম্পূর্ন দেহশৈলী দিয়ে আমাদের প্রত্যেককে পাঠিয়েছেন। আমাদের আচরণ, অভ্যাস এবং জীবনযাপনে অপরিমিতি ও অনাচারের কারণেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা রোগ ভোগ করি, যন্ত্রনা-অস্বস্তির শিকার হই।
যেমন, হৃদরোগের কথা বলা যায়। সারাবিশ্বে প্রতিবছর ১ কোটি ৭৫ লক্ষ লোক সরাসরি হৃদরোগের কারণে মারা যায়। এ সংখ্যা উন্নত বিশ্বে মোট মৃত্যুর ৪৫% এবং উন্নয়নশীল দেশে মোট মৃত্যুর ২৫%। অথচ কিছু সাধারণ বিষয় মেনে চললে, একটু সচেতনতা ও জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে সহজেই এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হৃদরোগ মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে।
হৃদরোগের চিকিৎসায় প্রায় ৫ দশকের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমাদের দেশে হৃদরোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অভাব সচেতনতার। হার্টের কোনো সমস্যা হলে প্রথমে আমরা আমলই দেই না। অনেকে মনে করি, হৃদরোগ কেবল ধনীদের রোগ।অথচ হৃদরোগের একটি প্রধান ধরন বাতজ্বর এবং বাতজ্বরজনিত হৃদরোগ গরিবদেরই বেশি হয়। আর জন্মগত হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপ ধনী এবং গরিব সবারই হতে পারে।
হৃদরোগ একদিনে হুট করে হয় না। দীর্ঘদিন ধরে একটু একটু করে ধমনীতে কোলেস্টেরল জমে মূলত এ রোগের সূত্রপাত ঘটে। ধমনীতে কোলেস্টেরল জমা শুরু হতে পারে ৮-১০ বছর বয়স থেকেই। তারপর রোগ দেখা দেয় সাধারণত মধ্য বয়সে। যে বয়সে একজন ব্যক্তি পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্যে অবদান রাখতে পারেন সে বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরিবারের বোঝায় পরিণত হওয়াটা দুঃখজনক। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধে মূল বিষয় হলো সচেতনতা। এজন্যে শৈশব থেকেই সুষম খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও সুস্থ জীবনধারা অনুসরণের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। কারণ, আজকাল অল্পবয়সী ছেলে-মেয়ে এমনকি শিশুদের মধ্যেও হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, মেদস্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপের হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এর প্রধান কারণ হলো- শাকসবজি-ফলমূল না খাওয়া, ফাস্টফুড ও কোমল পানীয়ের প্রতি আসক্তি এবং খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়া।
শরীরের ওপর মনের প্রভাব অপরিসীম। তাই শরীরকে যেমন সুস্থ রাখতে হবে তেমনি মনকেও রাখতে হবে সুস্থ। মনের প্রভাবে কোনো কোনো সময় বুকে ধড়ফড়, ব্যথা, পেটের অসুখ, এজমা ইত্যাদি অসুবিধাহয়। এছাড়া মানসিক চাপে বিভিন্ন রোগও বাড়তে পারে। মনোদৈহিক এ রোগকে সারাতে হলে মনের জোর বাড়াতে হবে। এজন্যে দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত নামাজ, প্রার্থনা ও মেডিটেশনের অনুশীলন করতে হবে। মানুষের মন অতীতের সুখ বা দুঃখ অথবা ভবিষ্যতের চিন্তা নিয়ে সবসময় অস্থির থাকে। এই অস্থির মনকে শান্তি ও কল্যাণের পথে আনতে হলে মেডিটেশনের বিকল্প নেই।
হৃদরোগের অনেক অত্যাধুনিক চিকিৎসা এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। কিন্তু এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস অপারেশনসহ এসব চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুলও বটে। এছাড়া ওষুধের পেছনেও হৃদরোগীদের খরচ খুব একটা কম নয়। আর এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তো আছেই। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে মেডিটেশন এবং লাইফস্টাইল ভিত্তিক বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। আমেরিকার ডা. ডীন অরনিশের চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ করে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, ব্যায়াম ও মেডিটেশনের মাধ্যমে হাজারো হৃদরোগী অপারেশন ও এনজিওপ্লাস্টি ছাড়াই সুস্থ হয়ে উঠছেন।