সমস্যাটা মনের ॥ সমাধানের সূত্রও পেয়েছি মনে

বছরখানেক আগে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অফ জুরিস্টস-এর একটি অধিবেশনে যোগ দিতে জার্মানিতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে ফ্রাংকফুর্ট এয়ারপোর্টে একটা দুর্ঘটনা হলো। বিমানের ল্যাডার থেকে পড়ে গেলাম মাটিতে। ১৪ দিন কোমায় ছিলাম। দেশে এসেও হাসপাতালে থাকতে হলো কিছুদিন। দুর্বলতা ছিলো। হাঁটতে কষ্ট হতো। তারপরও ধীরে ধীরে সেরেই উঠছিলাম। কিন্তু কিছুদিন আগে আমার প্রিয়জনের কিছু সমস্যার কারণে মানসিক উদ্বেগ, কষ্ট এবং দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হলাম। সন্ধ্যার দিকে অনুভব করলাম মাথার পাশে যেন চিনচিন করছে। একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমালাম। সকালবেলায় দেখি নিজে নিজে আর উঠতে পারছি না, কথাও বলতে পারছি না। আমাকে হাসপাতালে নেয়া হলো। ডাক্তার বললেন, সেরিব্রাল এটাক হয়েছে। সেই থেকে স্বাভাবিক সুস্থ জীবনের হলো ছন্দপতন।
এমন সময় আমার নাতনি সাদিয়া, নাজিয়া, রাইসা ধরলো, ‘নানা ভাই, মেডিটেশনে চলো। তুমি ভালো হয়ে যাবে।’ এদিকে আমার মনেও চলছে ভাবনার তোলপাড়, শরীরের কোনো সমস্যা তো আমার অসুস্থতা ঘটায় নি। এ শরীর নিয়েই তো এতদিন দিব্যি ছিলাম। যেদিন টেনশন করলাম, মনে কষ্ট পেলাম সেদিনই অসুস্থ হলাম। তার মানে অসুখটা মনে, হৃৎপিণ্ডে নয়; সমস্যাটা ব্রেনের চিন্তায়, স্নায়ুতে নয়। অর্থাৎ সমাধানের সূত্রও রয়েছে মন আর দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। অতএব নাতনিদের পরামর্শ গ্রহণ করে কোয়ান্টাম মেথড কোর্সের ২৭২ তম ব্যাচে অংশ নিলাম স্ত্রী-কন্যা ও নাতনিকে নিয়ে।
দেখলাম আমার পর্যবেক্ষণ সঠিক। কোর্সের প্রথম দিন গাড়ি থেকে নেমে হলে এসে বসতে আমার লেগেছিলো কয়েকজনের সহযোগিতা। দ্বিতীয় দিন শুধু লাঠিতে ভর করেই হেঁটে এসেছি। আর তৃতীয় এবং চতুর্থ দিন লাঠি এবং কারো সহযোগিতা ছাড়াই আমি হাঁটছি, কথাও বলতে পারছি বেশ স্পষ্টভাবে। কারণ কোর্সের এ দিনগুলোতে ক্রমান্বয়ে মানসিকভাবে উজ্জীবিত হয়ে ওঠার সাথে সাথে সম্পন্ন হয়েছে আমার সুস্থতাও।
শুধু সুস্থতাই নয়, কোর্সে এসে সতীর্থ এবং এখানকার কাউন্সিলর অর্গানাইজার প্রো-কোয়ান্টিয়ার- সবাই যেভাবে সহযোগিতা করেছেন, সমমর্মিতা এবং শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেছেন সেটা আমাকে অভিভূত করেছে, আশাবাদী করেছে। একবার বিদেশ ভ্রমণের সময় মালপত্রসহ হুইল চেয়ারে বসা অসুস্থ আমাকে নিয়ে আমার স্ত্রী বেশ অসহায় বোধ করছিলেন। সেসময় একজন বিদেশি সহযাত্রী যেভাবে সহযোগিতা করেছিলেন তা আজও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি। আসলে একটি জাতির উত্থানের প্রকাশ হচ্ছে মানুষের নিঃস্বার্থ সেবার মানসিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমমর্মিতায়। এখানে এসে আমি এর সবই পেয়েছি।
আমার জন্ম ১৯২৮ সালের ১০ আগস্ট কুমিল্লার মুরাদনগরে। দাদা ও বাবা দুজনই ছিলেন লব্ধপ্রতিষ্ঠ আইনজীবী। সমৃদ্ধ আইন পেশার সুবাদে দাদা হাজী আবদুস সোবহান একটা জমিদারিও কিনে ফেলেন। মুরাদনগরের সে জমিদার বাড়িটি এখনো আছে।
আমি ছিলাম বংশের প্রথম সন্তান। প্রাচুর্য এবং প্রশ্রয়- দুটোই পেয়েছি অঢেল। কিন্তু বখে যাই নি। কারণ একজন দায়িত্বশীল পিতার মতোই আমার বাবা তার সন্তানদের লালন করেছেন সীমিত চাহিদায় অভ্যস্ত করে, কষ্ট এবং পরিশ্রমের মানসিকতা দিয়ে। জমিদারের ছেলে হয়েও বছরে আমরা পেতাম সাধারণ কাপড়ের দুই সেট জামা-হাফপ্যান্ট। কলেজে পড়ার সময় ঢাকা-কুমিল্লা যাতায়াত করেছি সবসময় ইন্টার ক্লাসে চড়ে। একবার কলেজ ছাত্রদের জন্যে রেলওয়ে একটা সুবিধা দিলো, যে ক্লাসের টিকেট কাটা হবে ভ্রমণ করতে পারবে তার ওপরের ক্লাসে। স্বাভাবিকভাবে আমি ইন্টার ক্লাসের টিকেট কেটে সেকেন্ড ক্লাসে চড়ে বাড়ি গেলাম। এটা শুনে বাবা বললেন, ‘কেন, থার্ড ক্লাসের টিকেট কেটে ইন্টার ক্লাসে আসতে পারলে না? এখনই যদি সেকেন্ড ক্লাসের আরাম-আয়েশে অভ্যস্ত হয়ে যাও, জীবনের আরো ঘাত-প্রতিঘাত তো সামলাতে পারবে না!’ এই ছিলো তখনকার অভিভাবকদের সন্তান লালনের দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে আমরা ভাই-বোন প্রত্যেকেই গড়ে উঠেছি সফল, আত্ম-পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত একেকজন মানুষ হিসেবে।
স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের এসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার হিসেবে চলে গেলাম লাহোরে। আমি খুব ভ্রমণপ্রিয় ছিলাম। সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়তাম। পাকিস্তানে গিয়েই ঘুরে এলাম সীমান্তবর্তী সোয়াত ভ্যালি, খাইবার পাস। এ চাকরির সময়ই ১৯৭১-এ চলে এলাম ঢাকায়, আর যাওয়া হয় নি। মুক্তিযুদ্ধে আমার দুভাই ছিলেন, আমার বোনের স্বামী যুদ্ধে শহীদ হলেন। স্বাধীন দেশে আমি আবারও শুরু করলাম আমার কর্মজীবন।
টাঙ্গাইলে ডিস্ট্রিক্ট জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর যখন অবসর গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন একটি সরকারি চিঠি এলো- হাইকোর্ট ডিভিশনে বিচারক হিসেবে যোগ দেয়ার জন্যে। পরে এসেছে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগ। পেশাজীবনে সবসময়ই চেষ্টা করেছি সততা ও বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালনের। লোভ বা অন্যায়ের সাথে আপস না করার শিক্ষা আমি ধারণ করেছি পারিবারিকভাবেই। ফলে সাফল্য, সম্মান ও সুনামের পাশাপাশি প্রশান্ত প্রাচুর্যও পেয়েছি।
জনশক্তি আমাদের অমূল্য সম্পদ। পৃথিবীর অনেক দেশে গিয়েছি- যতই দেখেছি, ততই মনে হয়েছে মেধা-প্রতিভা-সম্ভাবনায় আমাদের তরুণ প্রজন্ম সত্যিই অসাধারণ। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে আমি লক্ষ্য করলাম- এখানে একদিকে তরুণদের জন্যে যেমন রয়েছে জীবনের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা, তেমনি নারীরা এখানে বিপুল সংখ্যায় সমবেত হয়েছেন আত্মনির্মাণ ও সৃষ্টির সেবায় শরিক হতে, একই সাথে বান্দরবানের অবহেলিত জনপদ লামায় চলছে নানামুখী সেবা কার্যক্রম।
কোয়ান্টাম মেথডকে আমার কাছে একটি বৈজ্ঞানিক এবং পরীক্ষিত প্রক্রিয়া বলে মনে হয়েছে। কারণ সাফল্য, সুস্বাস্থ্য ও প্রশান্তি অর্জনের কমান্ড যখন মেডিটেশনের আলফা লেভেলে দেয়া হয়, সেটাই স্থায়ী হয়, কার্যকরী হয়। সুস্থতার জন্যে কোর্স করতে এসেও আমার উপলব্ধির ভাণ্ডারে জমা হয়ে গেল আরো অনেক মূল্যবান রত্ন।