সততা আর আন্তরিকতাই বিজয়ের মূলমন্ত্র

Bangla
রামেন্দু মজুমদার
জাতীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে নব্য থিয়েটার আন্দোলনের তিনি পথিকৃৎ। তার নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের থিয়েটার গ্রুপগুলোর কমন প্লাটফরম গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন। ২০০৮ সালে তিনি বিশ্ব নাট্য সভা- ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি দ্বিতীয় এশীয় যিনি এ সম্মাননায় ভূষিত হন।

আমার দাদু প্রচণ্ড দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে লেখাপড়া শিখেছিলেন। প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী হিসেবে বাড়িঘর এমনকি একটা জমিদারি পর্যন্ত কিনে রেখে গিয়েছিলেন বংশধরদের জন্যে। আমার বাবা এবং কাকাও খুব সফল আইনজীবী ছিলেন। কিন্তু আমাদের কখনো বিলাসিতায় অভ্যস্ত হতে দেন নি। আমার মা কলকাতার মেয়ে ছিলেন। গান করতেন, বেহালা বাজাতেন। কিন্তু বিয়ের পর নোয়াখালির এক গণ্ডগ্রামের সংসারজীবনে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। এসব কারণে আমি হয়ে উঠেছিলাম কষ্টসহিষ্ণু, যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার মানসিকতা সম্পন্ন।

আমার বাবা সবকাজ আগেভাগে গুছিয়ে রাখতেন। এসএসসি-র রেজাল্ট হওয়ামাত্র একটা টেস্টিমোনিয়াল দিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। ফলে রোল নাম্বার হলো ১। কী যে বিড়ম্বনা সবার কাছেই চেনা, প্রক্সি দিয়ে যে ক্লাস ফাঁকি দেবো সে সুযোগ নেই।

কলেজ শেষ করে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। জগন্নাথ হলে ৩ জন অনন্য সাধারণ মানুষকে অভিভাবক হিসেবে পেয়েছিলাম। আমাদের প্রভোস্ট ড. জি সি দেব এবং হাউজ টিউটর ছিলেন ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা ও সন্তোষ ভট্টাচার্য। ড. দেবকে আমরা ঋষিতুল্য মানুষ হিসেবে দেখতাম। জাগতিক বিষয়ে তার উদাসীনতা নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত ছিলো। একবার হলো- সামান্য এক মারামারির ঘটনার বিচারে বসেছেন ড. দেব। আমরা একপক্ষের লোকজন ঘরে ঢুকে দেখি তিনি আলো নিভিয়ে বসে আছেন। আমরা কারণ জিজ্ঞেস করলে বললেন, এত আলো আমার এখানে আসবে যে, তাদের আলোতেই ঘর আলোকিত হয়ে যাবে।

জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতাকে পেয়েছি আমার ইংরেজি বিভাগেও। চমৎকার পড়াতেন। নাটকের সূত্রে মুনীর চৌধুরীর কাছে তিনিই আমাকে পাঠান।

শিক্ষার পর পেশাজীবনেও এলো সহজ সুযোগ। ফল বেরোবার আগেই চৌমুহনী কলেজে যোগ দিলাম ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে। তখন বেসরকারি কলেজে প্রভাষকের পদ ছিলো না, সবাই অধ্যাপক। সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ টি হোসেইনের স্নেহানুকূল্যে এক ভোরে রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে আমার চাকরি হয়ে গেল। ভীষণ আনন্দময় ছিলো সে দিনগুলো। নকল বা ছাত্র সংগঠনগুলোর বিরোধ- সবকিছুর বিরুদ্ধেই সেসময় যে আত্মবিশ্বাস আর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দাঁড়াতাম- এখন সেটা প্রায় ভাবাই যায় না।

কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে সে সুখের দিনগুলো ছেড়ে চলে যেতে হলো করাচিতে একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থার চাকরি নিয়ে। মজার ব্যাপার হলো, এর ১ বছরের মাথায় আমি যেমন আবার ফিরে এসেছিলাম চৌমুহনীতে, তেমনি ফিরে গিয়েছিলাম করাচির সেই বিজ্ঞাপনী সংস্থায় তারও বছর দু-এক পরে।

দ্বিতীয় দফায় করাচি থেকে সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় যেদিন ফিরলাম, তারিখটা ছিলো ১৯৭১ সালের ৯ মার্চ। দেশের পরিস্থিতি তখন ক্ষুব্ধ। শুধু একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাঙালি জাতি কোনোদিন এত ঐক্যবদ্ধ হয় নি, আর সে উদ্দেশ্যটি ছিলো আমাদের স্বাধীনতা ক্ষুধা থেকে, দারিদ্র থেকে, সামাজিক বৈষম্য থেকে।

স্বাধীনতার পর পর আমরা সবাই রাজি হয়েছিলাম যে, ১ হাজার টাকার বেশি কারো বেতন হবে না। সবাই সবার দুঃখকে ভাগাভাগি করে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলো, সে চেতনাকে আর ধরে রাখতে পারি নি। কে কত দ্রুত বড়লোক হতে পারে সে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠলো একদল লোক। অন্যরা তখন ভাবলো- আমার পাশের লোকটা এত অযোগ্য হয়েও লাখ লাখ টাকা কামাই করছে, তাহলে আমি কী করলাম! সে-ও তখন শামিল হয়ে গেল এ প্রতিযোগিতায়।

স্বাধীনতার পর আমরা নতুনভাবে নাট্যচর্চা শুরু করলাম। টিকিটের বিনিময়ে নিয়মিত বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় নাটক। সমাজের অসঙ্গতির কথাগুলো নাটকের মাধ্যমে উঠে আসতে লাগলো। চিন্তার খোরাক যোগাতে লাগলো। টিভি চ্যানেল আর প্যাকেজের এই যুগেও এখন অনেকেই মঞ্চে এসব নাটক দেখছেন। যদিও পেশা হিসেবে মঞ্চনাটককে নেয়ার সুযোগ এখনো আসে নি।

ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ কেন্দ্র স্থাপিত হয় ১৯৮২ সালে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নাট্যকর্মীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে। এ পর্যন্ত আমরা ৯টি আন্তর্জাতিক সেমিনার ও নাট্যোৎসব করেছি এর ব্যানারে। প্রতি দুবছরে বের করেছি ‘ওয়ার্ল্ড অফ থিয়েটার’ নামে একটি বড় প্রকাশনা যাতে থাকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নাটকের ক্ষেত্রে সামপ্রতিক অর্জনের বিবরণ। বিদেশিরা অবাক হয়েছে যে, বাংলাদেশের মতো একটা গরিব দেশে কী করে এটা সম্ভব। আমরা তখন বলেছি, তোমরা আগে বাজেট যোগাড় কর, তারপর কাজে হাত দাও আর আমরা কাজ শুরু করে দেই, বাজেটের যোগাড় হয় তারপর। কারণ, কাজটি ভালো- এ প্রত্যয়ে উজ্জীবিত হলে আমরা আন্তরিকভাবে তা করতে পারি আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে।

সততার চর্চাটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার। শুধু নেতা-নেত্রীর জন্যে নয়, আম জনতার জন্যেই। কারণ কথায় আছে, যে জাতি যেমন, সে তেমন নেতৃত্বই পায়। দরকার হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে সৎ, আদর্শবান নেতা নির্বাচনে আসতে পারেন। যেমন ভারতেও দুর্নীতি আছে। কিন্তু তার একটা মাত্রাও আছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও তার দুই রুমের ফ্ল্যাটটা ছাড়েন নি। স্ত্রী অফিসে যান ট্যাক্সি ক্যাবে চড়ে।

কোয়ান্টাম মেথড কোর্সে আমার স্ত্রী অংশ নিয়েছিলেন। তখন আমি সঙ্গে এসেছিলাম। দেখেছি যে, সত্যিকার অর্থেই এখানে আত্মার শুদ্ধি সম্ভব, সম্ভব আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে বড় কাজ করা। মানুষের কল্যাণব্রতী এ ফাউন্ডেশনের প্রতি রইলো আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা।