শুরু করতে হবে নিজেকে দিয়ে

আমার বাবা ১৯২৯ সালে আইিসিএস পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছিলেন। তিনি কর্মজীবন শুরু করেন সরকারের সহকারী সচিব হিসেবে। রিটায়ারের সময় তার বাড়িতে যে আসবাবগুলো ছিলো, এনটিকস হিসেবে হয়তো তার কিছুটা মূল্য আছে কিন্তু আজকাল একজন পিয়নের বাড়িতেও দেখা যাবে এর চেয়ে দামী, সুন্দর আসবাবপত্র। তিনি যে ডিপার্টমেন্টের সচিব ছিলেন সেটি ঢাকার সব খাস জমি তত্ত্বাবধান করতো। ইচ্ছে করলেই তিনি প্রচুর জমিজমার মালিক হতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি। শেষমেষ নানা অনুরোধ-উপরোধে বাবা একটা দরখাস্ত করলেন ঢাকার ধানমণ্ডি এলাকার সবচেয়ে ছোট প্লটটির জন্যে। ঐ প্লটটিতেই এখন আমাদের একমাত্র বাড়ি। কারণ গ্রামের বাড়ির সবকিছু পদ্মায় ভেঙে গেছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাবেন আর অফিসে নিজের দায়িত্ব পালন করবেন- এটিই ছিলো বাবার চিন্তা। তিনি একাই নন, সেসময়ে সমাজের শিক্ষিত পেশাজীবী মানুষেরা এভাবেই ভাবতেন।
কিন্তু সেদিন আর নেই। এখন চলছে কনজিউমারিজম বা ভোগবাদের যুগ। এখন প্রত্যেক ঈদেই আমাদের নতুন কাপড় কিনতে হয়। দুদিন পর পর রেস্তোরাঁয় না খেলে তৃপ্তি হয় না। একটা বিয়ের জন্যে ১০টি অনুষ্ঠান করতে হয়। বিলাসবহুল কমিউনিটি সেন্টারে একেকটি আয়োজন করতে গিয়ে অর্থের যে অপচয় আমরা করি তা যেন কোনো ব্যাপারই নয়। অর্থাৎ সবার মধ্যে একটা ভোগের মানসিকতা, লোভের কামনা। আর এ প্রবণতাই আমাদেরকে ঠেলে দিয়েছে আজকের এই ব্যাপক দুর্নীতিগ্রস্ততার দিকে।
ছোটবেলায় বাড়িতে দেখেছি মায়ের ঘরের তাকে সারি দিয়ে রাখা হয়েছে অজস্র বই। আমার জীবনের প্রথম আনন্দের দিন ছিলো- ক্লাস ফোরে পড়ার সময় পত্রিকায় আমার একটা লেখা ছাপা হওয়ার পর বাবা আমাকে এক টাকা দিয়ে একটা গীতাঞ্জলি কিনে দিয়েছিলেন। সেই গীতাঞ্জলিটা আমার কাছে এখনও আছে। এখন কিন্তু কোনো বাবা তার ছেলেকে গীতাঞ্জলি দিয়ে খুশি করতে পারবেন না। এখন ছেলেকে হয় চাইনিজ নয়তো পিৎজা বা আইসক্রিম খাওয়াতে হবে। আমরা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে গিয়ে ঝাড়বাতি দেখেছি, বাড়িতে লাগানোর চিন্তা করি নি। কিন্তু এখন ঢাকায় এমন অনেক বাড়ি আছে যেখানে ড্রয়িংরুমের ঝাড়বাতিটার দামই দশ লাখ টাকা। ধনীরা এখন ধনের প্রদর্শনী করতে বেশি উদগ্রীব।
দুর্নীতি কমাতে হলে প্রথমে প্রয়োজন এই ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন যা শুরু হবে শিশুর পারিবারিক পরিবেশ থেকেই। শোকর এবং সবরের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। যা পেয়েছি এজন্যে আল্লাহর কাছে শোকর বা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং যা পাই নি এজন্যে সবর অর্থাৎ ধৈর্য ধারণ, যাতে আল্লাহ দেন। আমাদের পরিবারগুলোতে এখন এ শিক্ষা দেয়ার মানসিকতা দুর্ভাগ্যবশত নেই।
বিশ্বব্যাংকের মতে দুর্নীতি হলো- Use of public property for private gain অর্থাৎ জনগণের সেবা না করে সরকারি অফিসের ক্ষমতা নিজের কাজে ব্যবহার করাই হলো দুর্নীতি। কিন্তু এটা দুর্নীতির একটা আংশিক সংজ্ঞা। ১৯৯৬ সালে আমরা দুর্নীতির ওপর প্রথম একটি জাতীয় জরিপ চালাই। এতে সাধারণ মানুষ দুর্নীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছিলো এভাবে যে- যার যা কর্তব্য সে যদি তা না করে তাহলে সেটাই হলো দুর্নীতি। দুর্নীতির এ ব্যাখ্যার সঙ্গে হজরত ওমর (রা)-এর একটি ঘটনার খুবই মিল পাই। হজরত ওমর (রা) আবু হোরায়রা (রা)-কে বাহরাইনের গভর্নর হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। কিছুদিনের মধ্যে আবু হোরায়রা ব্যবসা-বাণিজ্য করে ধনী হয়ে যান। হজরত ওমর তখন তাকে ডেকে পাঠান এবং শাসন কাজের চেয়ে ব্যবসায়ে বেশি মনোযোগ দেয়ার ব্যাপারে জবাবদিহি করতে বলেন। হযরত ওমরের যুক্তি ছিলো একজন সরকারি কর্মচারি শুধু দাপ্তরিক সময়ের জন্যে নয় বরং ২৪ ঘণ্টার জন্যেই জনগণের সেবক। এর খেলাফ করা মানেই নীতিহীনতা। এজন্যে পরে আবু হোরায়রার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
এখন সরকারি চাকরি নিয়ে কত কথাই পত্রিকায় দেখি। প্রাইমারি স্কুলের একটা চাকরির জন্যে নাকি ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। চাকরি পাওয়ার পর স্বাভাবকি শিক্ষক টাকাটা নানাভাবে তোলার চেষ্টা করেন। ছাত্রবৃত্তির টাকা বা খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচির টাকা থেকে সরিয়ে, বই ছাত্রদের না দিয়ে বাইরের দোকানে বিক্রি করে বা প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করে ইত্যাদি নানাভাবে এখন দুর্নীতি হয়।
কিন্তু ঘুষ নেয়া বা ট্যাক্স ফাঁকি দেয়াই শুধু দুর্নীতি নয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক থাকাকালীন বারডেমের প্রতিষ্ঠাতা ডা. ইব্রাহীমের সারাদিন কাটতো হাসপাতালে রোগী দেখে ও ক্লাস নিয়ে। আজকাল এটা একটা বিরল ব্যাপার। ডাক্তাররা বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। এমন ডাক্তারও আছেন যিনি একসাথে ৪/৫ জন রোগী দেখেন। কর্তব্যের এ অবহেলা কি দুর্নীতি নয়? এই যে খাবারে ভেজাল দেয়া হচ্ছে, ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণের কারণে ভবন ধসে পড়ছে, জমির সীমানা ছাপিয়ে সরকারি জায়গা দখল করা হচ্ছে- এগুলো কি দুর্নীতি নয়?
দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে তদনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থাও করতে হবে। যেমন, সিঙ্গাপুরে দুর্নীতি ধরা পড়ার সাথে সাথে তার বিচার হয় এবং শাস্তি হিসেবে এমনকি মৃত্যুদণ্ড দেয়ারও দৃষ্টান্ত রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা- দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে শুরু কিন্তু করতে হবে নিজেকে দিয়েই। জবাবদিহিতাটা থাকতে হবে নিজের কাছে। বিশ্বাস করতে হবে যে, আমার হিসেব নেয়ার জন্যে আছেন এমন একজন যার কাছে কিছু ফাঁকি দেয়া যায় না। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার পর আমাকেও অনেক রকম হয়রানি, জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমার ২০ বছরের ইনকাম ট্যাক্স রিটার্নের কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু এতে আমার কোনো অস্বস্তি নেই। কারণ আমি খুব চুলচেরা হিসেব করে বলতে পারবো যে, চাকরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি কত টাকা পেয়েছি।
বিশ্বজুড়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মোট ১১২টি চ্যাপ্টার আছে। বাংলাদেশকে বলা হয় স্টারশিপ অফ দি মুভমেন্ট। কারণ দুর্নীতি নিয়ে আমরা তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কাজ করেছি। অন্যান্য দেশে যেখানে জাতীয়দুর্নীতি নিয়ে কাজ হয়েছে সেখানে আমরা কাজ করছি তৃণমূল পর্যায়ের দুর্নীতি নিয়ে। আমরা কেবল দুর্নীতির পরিমাণই বের করছি না, তার প্রতিকারের পরামর্শও দিচ্ছি।
আমার কাজের জন্যে সরকার, পুঁজিপতি, ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রচুর সমালোচনা শুনতে হয়। কিন্তু যখন সাধারণ মানুষের কাছে যাই, তখন পাই অফুরন্ত ভালবাসা আর শ্রদ্ধা। এখন সরকার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষদের মধ্যে অন্তত একটা সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে যা আগে ছিলো না। আমি আশাবাদী যে, এ অবস্থার উত্তরণ হবে। কারণ এখনও দুর্নীতি যারা করেন তাদের চেয়ে যারা দুর্নীতি করেন না, তাদের সংখ্যাই বেশি।