শিশুকে স্বনির্ভর ও শারীরিক শ্রমে অভ্যস্ত করাতে হবে

জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলতেন, আল্লাহর পরে রোগী যাকে বিশ্বাস করে সে হলো ডাক্তার। একজন ডাক্তার তার সেবা দিয়ে, সুস্থতার কথা বলে রোগীর মনে যেভাবে সাহস যোগাতে পারে, তা আর কেউ পারে না।
ম্যাডাম হাসিনার ছেলে জয়ের বয়স যখন মাত্র ১৬ দিন, তখন (বর্তমানে মরহুম) ওয়াজেদ সাহেব অর্থাৎ জয়ের বাবা একদিন রাত ১টার সময় দৌড়ে এলেন। এসে বললেন, বাচ্চাটার এখন-তখন অবস্থা। পেট ফুলে ঢোল। ধানমণ্ডি ১৮ নম্বরের একটা বাড়িতে মা-সহ বাচ্চা বন্দি আছে। আমি কিছু করতে পারি কি না।
আমি দৌড়ে গেলাম। দেখে বুঝলাম হাসপাতালে নিয়ে টিউব দিয়ে পেট থেকে গ্যাস বের করে ফেলতে পারলেই সবচেয়ে ভালো হতো। কিন্তু হাসপাতালে নেয়ার সুযোগ নেই। তাই বললাম চিন্তা করবেন না, একটা ওষুধ দিচ্ছি। আস্তে আস্তে ভালো হয়ে যাবে।
তা-ই হলো। মরেই যাচ্ছিলো যে বাচ্চাটা, সে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠলো। সেই স্মৃতিটা ম্যাডাম হাসিনার এখনো আছে। সেদিন যশোর এয়ারপোর্টে তার সঙ্গে দেখা। সঙ্গে ছেলে জয়। আমার সাথে কুশল বিনিময়ের পর ছেলেকে বললেন, এই সালাম কর। তোকে বাঁচিয়েছেন। আমি বললাম, ম্যাডাম আমি বাঁচাই নি। আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। আমি চেষ্টা করেছি মাত্র। তিনি বললেন, আপনি আসাতেই তো আল্লাহর সাহায্য পেয়েছি।
একজন সফল চিকিৎসক তিনিই যিনি এ ভরসাস্থল হতে পারেন। সেজন্যে তাকে পেশাগত যোগ্যতার পাশাপাশি রোগীর মানসিক অবস্থা বোঝার সামর্থ্যও অর্জন করতে হবে। ইব্রাহীম স্যার যে দুটি বৈশিষ্ট্যডাক্তারদের আয়ত্ত করতে বলতেন তার একটি হলো সিমপ্যাথি, অন্যটি এমপ্যাথি। সিমপ্যাথি হলো সহানুভূতি। লোকটা গরিব। তাকে ৫ টাকা বা ১ টাকা দিয়ে দিলাম- এটা এক ধরনের অনুভূতি। আর এমপ্যাথি হলো সহমর্মিতা। যে কষ্ট, যে যন্ত্রণা ঐ লোকটা পাচ্ছে তা যদি আমিও অনুভব করি, একই ব্যথায় ব্যথিত হই, তাহলেই ঐ লোকটাকে নিকটাত্মীয় ভেবে আমি চিকিৎসা করতে পারবো।
আমার ছাত্র-সহকর্মীদেরকে আমি একটি কথাই বলি যে, এমনভাবে কাজ করবে যেন রোগী মারা গেলেও আত্মীয়-স্বজন বলতে বলতে যায়, হায়াত নেই তাই মারা গেছে। ডাক্তার সাহেব চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেন নি।
শিশুরা হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একটি শিশুর ভালো বেড়ে ওঠা যদি আপনি নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে একজন সফল মানুষ, ভালো মানুষের গ্যারান্টিও আপনি পেতে পারেন। প্রথমেই হলো খাবার। ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের দুধ এবং ৬ মাসের পর থেকে ভাত-মাছ-ডাল; শিশুর জন্যেও এগুলোই যথেষ্ট। শিশুর জন্যে কৌটা দুধ, ফাস্টফুড- এগুলোর চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আর কিছু নেই। এখন বাজারের অনেক দুধেই ক্ষতিকারক মেলামিন পাওয়া গেছে। তার চেয়ে গরুর দুধ বা সয়াদুধ খাওয়ানো যেতে পারে। সয়াবিন থেকে যেমন তেল হয়, তেমনি দুধও পাওয়া যায়। যদিও এর স্বাদ একটু ভিন্ন, কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্যে এটি বেশ উপকারি। কারণ এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত প্রোটিনসহ সব খাদ্যমান। আর যেসব শিশু ফাস্টফুড গ্রহণ করে, তারা অল্প দিনেই মোটা হয়ে যায়। তৈরি হয় কোষ্ঠকাঠিন্যসহ নানা ধরনের সমস্যা।
অনেক মায়ের অভিযোগ, তার সন্তান খায় না। যদি কোনো শিশু ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৬ বার প্রস্রাব করে, তাহলে বুঝতে হবে সে তার পরিমাণ মতো খাবার ঠিকই খাচ্ছে।
আর হচ্ছে শারীরিক শ্রম। একটি বা দুটি সন্তানকে ননীর পুতুলের মতো সারাক্ষণ আগলে রেখে ফার্মের মুরগি বানাচ্ছেন আজ-কালকার বাবা-মায়েরা। এটা না করে সন্তানকে স্বনির্ভর ও শারীরিক শ্রমে অভ্যস্ত করাতে হবে।
আমার পরিচিত মহলে বেশ প্রচলিত একটি কথা হলো- ওজনের মেশিনে ভুল হতে পারে কিন্তু আমার ওজনে নাকি কোনো ভুল হয় না। গত ২০ বছর ধরে একই ওজন ধরে রেখেছি। এর রহস্য খুব সহজ। বৈজ্ঞানিক খাদ্যাভ্যাস, শৃঙ্খলা আর রাগ বর্জন। আমি সবসময় রাগ বর্জন করার চেষ্টা করি। কখনও যদি রাগ আসতে চায়, আমি চুপ হয়ে যাই। কারণ রাগ মানেই উত্তেজনা। আর উত্তেজনা মানে এড্রিনালিন সিক্রেশন। যার শারীরিক প্রভাব সবসময়ই ক্ষতিকর। এজন্যেই বলা হয় রাজ্য জয় বা শাসন করার চেয়েও সে বেশি সফল যে রাগকে দমন করতে পারে। মহামানবরা এ কাজটিই করেছেন।
একবার এক বেদুইন রসুলুল্লাহ (স)-কে গালি দিচ্ছিলো। কিন্তু তিনি কোনো জবাব তো দিচ্ছিলেনই না বরং মিটিমিটি হাসছিলেন। এমন সময় আবুবকর (রা) সেখানে উপস্থিত হয়ে বেদুইনকে গালির জবাব দিলেন। সাথে সাথে নবীজী (স) বললেন, এতক্ষণ যে ফেরেশতাটি আমার আমলনামায় নেকি এবং তার আমলনামায় বদি লিখছিলো, তুমি আসাতে সে চলে গেল।
সুস্থ সফল জীবনের এসব দৃষ্টিভঙ্গির কথাই কোয়ান্টাম বলছে। ৩০০ কোর্সের মধ্য দিয়ে এ দৃষ্টিভঙ্গিই সঞ্চারিত হয়েছে হাজারো মানুষের মধ্যে। এটা সত্যিই একটা ইতিহাস। কারণ আমাদের দেশকে এগিয়ে নিতে গেলে যে সচেতন, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা বোধসম্পন্ন মানুষ প্রয়োজন, সে মানুষ গড়ার উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করে চলেছে কোয়ান্টাম। এ উদ্দেশ্য সফল হোক- এটাই কামনা করি।