- বাংলা
- English
মেডিটেশন করুন সুফল পাবেনই

মেডিটেশন করুন সুফল পাবেনই
চমৎকার মালভূমি। তার ঢালে বসে মেডিটেশন করছে অসংখ্য মানুষ। একটি বিদেশি ম্যাগাজিনে দেখেছিলাম ছবিটি। সেখানে মেডিটেশন এখন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে চলে এসেছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানে এ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। প্রাচীন উপমহাদেশের যোগী, সন্ন্যাসী ও দরবেশদের ধ্যান বা মেডিটেশন এখন প্রায় এক কোটি আমেরিকানের নিয়মিত চর্চার বিষয়। বাংলাদেশেও মেডিটেশন বর্তমানে সচেতন মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করছে। আর কোয়ান্টাম মেথড এ চর্চারই একটি সফল দৃষ্টান্ত। মানুষের ভেতরে একটি শক্তি রয়েছে। এ শক্তির উন্মেষ মানুষের মতো করে অন্য কোনো প্রাণী ঘটাতে পারে না। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো- মানুষ এখনো তার ব্রেনের সবটুকু ব্যবহার করতে পারে নি। প্রকৃতিগত চর্চা, যেমন মেডিটেশনের মাধ্যমে মানুষ কিন্তু তার ব্রেনকে বেশি পরিমাণে ব্যবহার করতে পারে। যত বেশি চর্চা তত বেশি নতুন কিছু উদঘাটনের সুযোগ।
এ-তো গেল ব্রেনের ব্যবহার। আমরা যদি মনের প্রশান্তির দিকে আসি তাহলে দেখা যাবে যে, ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে দেহ-মনকে শিথিল করে শুধু শরীরের নয় মনের প্রশান্তিও আনা সম্ভব। আর প্রশান্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমার মন যদি ভালো থাকে, প্রশান্ত থাকে তাহলে অনেক বিরক্তিকর ব্যাপারকেও সামান্য মনে হয়। শারীরিক কষ্টকে মনে হয় তুচ্ছ। এমনকি মানুষের জীবনে যখন কিছু ভয়ঙ্কর সময় আসে, যেমন ক্যান্সার বা এসিডে পোড়ার মতো টারমিনাল ইলনেস, যখন প্রচণ্ড যন্ত্রণায় শরীর-মন বিদ্ধ, সে অবস্থায়ও কিন্তু মেডিটেশনের মাধ্যমে কিছুটা প্রশান্তি পাওয়া সম্ভব। মেডিকেল জার্নালে এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে।
আসলে রিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিস, মিগ্রেন বা নানারকম ক্রনিক ব্যথা-বেদনার চিকিৎসা হিসেবে যে পেইনকিলার, স্টেরয়েড ইনজেকশন ইত্যাদি দেয়া হয়, তার মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। আমেরিকায় ১৯৬০ সালের গোড়ার দিকে এবং পরে আবার ১৯৭০ সালের দিকে যখন হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হার্বার্ট বেনসন হার্টের রোগীদের মেডিটেশন করাতে থাকেন, তখন থেকে এটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ালো। মেডিটেশন চর্চার ফলে রোগীদের রক্তচাপ ও মানসিক চাপের প্রশমনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল দেখে হার্বার্ট বেনসন চমৎকৃত হলেন। তার বেস্ট সেলার ‘রিলাক্সেশন রেসপন্স’ বইয়ে রয়েছে এর বর্ণনা। বোস্টনে বেনসন চালু করেন মাইন্ড-বডি ইনস্টিটিউট। বেনসনের গবেষণালব্ধ উক্তি- ডাক্তারদের কাছে যে রোগীরা পরামর্শের জন্যে যায়, তাদের ৬০-৭০ শতাংশ হলেন চাপগ্রস্ত মানুষ। এসব অসুখ ওষুধ বা শল্য চিকিৎসা দিয়ে নিরাময় হয় না। তবে মনোদৈহিক চিকিৎসা করে অত্যন্ত সুফল পাওয়া যায়।
আসলে মাইন্ড ইজ দ্যা বেস্ট হিলার। অর্থাৎ মন হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট নিরাময়কারী। অনেকে নিরাময় বলতে মনে করেন ওষুধ গ্রহণ করে শরীর ভালো হওয়া। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্থা স্বাস্হ্যের সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে : Health is defined as not only the absence of disease or infirmity. It is the complete mental, physical, social and spiritual well-being. অর্থাৎ আমার রোগ নেই বা আমি পঙ্গু নই- এটাই স্বাসহ্য নয়।স্বাসহ্য হলো আমি শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আত্মিক- এই সবদিক থেকেই ভালো আছি কি না। যেমন, আমার ভালো লাগছে না বা আমার মনে আনন্দ নেই- এটাও কিন্তু অসুখ। আর তাই পরিপূর্ণ নিরাময় বলতে শরীর, মন, আত্মা সবকিছুর নিরাময়কেই বোঝায়। সেজন্যে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে এখন ‘টোটাল পার্টিসিপেশন প্রসেস’ ধারণাটি প্রচলিত যেখানে চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় ডাক্তার এবং রোগী একে অপরকে সহযোগিতা করেন। কারণ রোগী যদি ডাক্তারের কাছে গিয়ে তৃপ্ত হতে না পারে (যা আজকাল হচ্ছে) তবে শরীরে সুস্থতা এলেও মনে আসে না। কারণ আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি রোগ হলো মানসিক। এসব ক্ষেত্রে রোগীকে যদি একটু আশ্বাস দেয়া যায়, তার সমস্যা শোনার প্রতি মনোযোগ দেয়া যায় এবং তাকে সুস্থ হওয়ার আত্মবিশ্বাস দেয়া যায় তাহলে অনেক সহজে তাকে সারিয়ে তোলা সম্ভব। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে পজিটিভ রি-ইনফোর্সমেন্ট।
তবে এমন নয় যে, ওষুধ গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে যে রোগ হয় বা দুর্ঘটনাজনিত অসুস্থতা- এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই মেডিসিন, সার্জারি ইত্যাদির আশ্রয় নিতে হবে। এক্ষেত্রে মেডিটেশন তাকে শারীরিক আরাম এবং মানসিক আশাবাদ দিয়ে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। যেমন, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মনোবিজ্ঞানী এলিস ডোমার দেখেছেন, ধ্যানচর্চার ফলে অপারেশনের রোগীর দুশ্চিন্তা কমেছে, অপারেশন মোকাবিলা করেছেন আরো ভালোভাবে।
আসলে যে পজিটিভ রি-ইনফোর্সমেন্টের কথা বললাম, এটা শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রে নয়, দৈনন্দিন জীবনেও খুব চমৎকার ফলাফল দিতে পারে। যেমন, কোনো বাবা যদি রাতে তার ছেলের বালিশের পাশে একটা ছোট্ট চিরকুটে লিখে রাখেন “থ্যাঙ্ক ইউ মাই সান” বা কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেন, তাহলে তাদের জন্যে তা এতটাই আনন্দের হতে পারে যা হয়তো অনেক কিছু দিয়েও হতো না। একই ব্যাপার হতে পারে কর্মীদের বেলায়ও যখন তারা বস্ বা মালিকের কাছ থেকে প্রশংসা পায় বা স্বীকৃতি পায়। এমনকি দেখা গেছে আর্থিক সুবিধা দিয়েও যে কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করা যায় নি, পজিটিভ রি-ইনফোর্সমেন্টের ফলে সে কর্মীদেরই উৎপাদনশীলতা বেড়ে গেছে অনেক গুণ।
এই ইতিবাচকতা, আশাবাদ তাদের পক্ষেই লালন করা সহজ যারা মেডিটেশন করেন, ধ্যানচর্চা করেন। কারণ ধ্যান মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে, জীবনকে রাখে চলমান। কাজে বাড়ায় মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমস্যা সমাধানকে করে সহজ। তাই সুস্থ থাকুন আর না-ই থাকুন- কয়েক মিনিটের জন্যে হলেও মেডিটেশন করুন। কারণ এর সুফল দেহ-মনের ওপর পড়বেই।