- বাংলা
- English
মূল্যবোধের পুনর্জাগরণই হচ্ছে আসল শক্তি

কেন এ পৃথিবীতে এলাম, জীবনটা কিসের জন্যে- এ জাতীয় প্রশ্নগুলো একজন সাধারণ মানুষের চিন্তার বাইরে। চিন্তা-চেতনায়, শিক্ষায়, মননচর্চায় অগ্রসর বিশেষ কিছু মানুষ এ চিন্তাটা করে থাকে। সাধারণ মানুষ বিশেষ করে আমাদের দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা ভাবলে দেখবো তাদের এসব চিন্তা করার অবকাশ নেই। তারা জীবনের বোঝা বহন করে চলেছে ভারবাহী পশুর মতো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যারা চিন্তা-চেতনায় উঁচুস্তরের তাদের জীবন-জিজ্ঞাসা কী। কোন ধরনের মূল্যবোধ দ্বারা তারা পরিচালিত হচ্ছে।
আমাদের চারপাশের দুর্গতি, অবনতি, দুর্নীতির চিত্রটা দেখেই আমরা বলে দিই মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে। কথাটি নিয়ে আমার দ্বিমত নেই। কারণ তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যানে আজ আমরা এক নম্বর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। দেশের দিকে তাকালে এ মূল্যায়নের যথার্থতা স্পষ্ট। ’৪৭-এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের দেশে অনেক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছিলো। কিন্তু তার অনেকগুলোই এখন আর চলছে না। ভারতের রেলওয়ে ব্যবস্থা পৃথিবীর প্রাচীন এবং প্রথম সারির রেলওয়ে ব্যবস্থার একটি। একই সিস্টেমের একটা অংশ আমরা পেলাম কিন্তু আমাদের রেলওয়ে সিস্টেমের অত্যন্ত দুরবস্থা। এটা এখন শুধু অলাভজনকই নয় সেবার গুণগত দিক থেকেও নিম্নমুখী।
আমাদের পোস্টাল সিস্টেমেও একই অবস্থা। আগে কলকাতা থেকে পাঠানো চিঠি একদিন পরেই আমরা গ্রামের বাড়িতে বসে পেয়েছি। আবার গ্রামের বাড়ির চিঠি পরের দিন কলকাতায় পৌঁছে যেতো। সেই পোস্টাল সিস্টেম এখনও আছে কিন্তু একদিনের জায়গায় চিঠি যেতে সাতদিন লাগে যদি আদৌ চিঠি যায়। শিক্ষারও অবনতি ঘটেছে। কথায় কথায় আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবের কথা বলি। একসময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বোঝানো হতো। এখন এ কথাটি আমার কাছে খুবই লজ্জাজনক মনে হয়। আমরা জানি শিক্ষার মান এখন কোথায় দাঁড়িয়েছে। এই যে বাস্তব চিত্রের কথা এতক্ষণ বললাম, এর পেছনে অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি আছে নৈতিক ব্যাখ্যাও। আজকের অচলাবস্থার কারণ আমাদের ইচ্ছাশক্তি, সততা ও সাংগঠনিক দক্ষতার অভাব; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনে অনীহা এবং যোগ্যতম ব্যক্তির শূন্যতা।
অথচ বাংলাদেশের উদ্ভব হয়েছিলো একটা প্রচণ্ড মূল্যবোধের ভেতর দিয়ে। আমরা দীর্ঘ ২৪ বছর পাকিস্তানী ঔপনিবেশিকতায় আবদ্ধ ছিলাম। আমাদের নাগরিক মর্যাদা দেয়া হয় নি। আমাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। একসময় উপলব্ধি করলাম আমরা পরাধীনতার জীবন যাপন করবো না। নিজেদের ভাবনা দিয়ে যেন নিজেদের ভাগ্য গড়তে পারি সে জন্যে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে আমরা একটা রাষ্ট্র গঠন করলাম। স্বাধীনতা আমাদের সামনে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার পথ খুলে দিলো। কিন্তু আমরা সে সুযোগের অপব্যবহার করলাম। প্রাপ্যের অতিরিক্ত পাওয়ার জন্যে সবাই ব্যগ্র ও লোলুপ হয়ে পড়লাম। সেবার মানসিকতা অপসৃত হয়ে গেল এবং শুধুমাত্র নেয়ার মনোভাব সেখানে এসে গেল। জাতির এ ব্যর্থতার মূল কারণ হচ্ছে মূল্যবোধের ব্যর্থতা।
এখন কীভাবে আমরা এ থেকে বেরিয়ে আসবো? কীভাবে আমরা ব্যক্তি জীবনে এবং সমষ্টি জীবনে মূল্যবোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবো? এর জন্যে দরকার মানুষের চেতনার পরিবর্তন, যা ধর্ম এবং শিক্ষা থেকে সে লাভ করবে। আশার কথা হচ্ছে এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণের চিন্তা-ভাবনা চলছে। সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত নয় এমন একটা গোষ্ঠী আছে যাদেরকে বলা হয় সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজ। সুশাসন এবং মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এ নাগরিক সমাজ কাজ করছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করা যেতে পারে। পরিবারকেন্দ্রিক নৈতিক ও জীবনমুখী ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে ছোটবেলা থেকেই একটি শিশুকে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে এই নতুন প্রজন্ম পরবর্তী দায়িত্ব পালনে যোগ্য নেতৃত্বের পরিচয় দেবে।
দৃষ্টান্ত স্বরুপ দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার কথা বলা যেতে পারে। ৩০ থেকে ৩৫ বছর পূর্বে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো অনুন্নত। জাতিগত সংঘাতও ছিলো প্রকটভাবে। সেই মালয়েশিয়া আজ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েছে উন্নত দেশের কাতারে। এটা সম্ভব হয়েছে মালয়েশিয়ার দক্ষ নেতৃত্বের কারণে।
আমি একটা কথা বলতে চাই যে, আমাদের পরিস্থিতি যথেষ্ট খারাপ। কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। আমাদেরও যদি এমন যোগ্য নেতৃত্ব আসে যিনি প্রকৃত মূল্যবোধে উজ্জীবিত- দেশে সুষ্ঠু প্রশাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করবেন এবং সেবক হিসেবে জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন তাহলে আমাদের দেশও ক্রমান্বয়ে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। কারণ আমি মনে করি, জনগণের চিন্তাধারা সঠিক পথেই আছে। শুধু তাদের দরকার একটি যোগ্য নেতৃত্বের নির্দেশনা।
তবে আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, রাষ্ট্রীয় জীবনে আমাদের অনেক ব্যর্থতা থাকতে পারে কিন্তু বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে একজন যদি তার নিজের আদর্শে, নিজের মূল্যবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে কিছু একটা গড়তে চান তিনি তা পারেন। আমি দেখেছি একজন ব্যক্তি কর্মজীবন শেষে অবসর জীবনে ঠিক করলেন গ্রামের স্কুলটাকে তিনি গড়ে তুলবেন এবং এ কাজে তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করলেন। মাত্র ১০ বছরের মধ্যে অজপাড়াগাঁয়ের একটি স্কুলকে তিনি অনেক উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। সেই স্কুলে এখন ২০০০ ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করছে।
চট্টগ্রামে দেখেছি একজন ডাক্তার নিজ উদ্যোগে একটি চক্ষু হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন এবং সেখানে বিশ্বমানের সেবা তারা দিচ্ছেন। বাংলাদেশের হাজার হাজার সন্তান বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জনের একটা অংশ দেশে পাঠাচ্ছে। তারা দেশের জন্যে কাজ করতে চাইছে। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায়ও অনেক শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে। কোনো কিছু গড়ার জন্যে যখন একজন ব্যক্তির একটা ভিশন বা মনছবি থাকে; যখন তিনি ঐকান্তিকভাবে কাজটি করতে চান তখনই তিনি সফল হন। যেমন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে আমি দেখছি, যেখানে রাষ্ট্রের আনুকূল্য ছাড়াই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যক্তি-প্রচেষ্টা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে কিছু গড়ার চেষ্টা করছে।
সুতরাং এই যে চাওয়া, একান্তভাবে চাওয়া, আমাদের চিন্তা-চেতনার সমস্ত শক্তি দিয়ে চাওয়া- এর ফল পাওয়া যাবেই। সেদিক থেকে আমি নৈরাশ্যবাদী নই। হয়তো স্বচক্ষে দেখে যেতে পারবো না, কিন্তু মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছি- অবক্ষয়, বৈষম্য এবং অবিচার দূরের সংকল্পের মাধ্যমে সবাই মিলে আমরা সুখী-সমৃদ্ধ একটি দেশ গড়ছি।