মানবিক বিশ্বায়নের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবেই

Bangla
অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ
অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান এবং নৃতত্ত্বের সাবেক অধ্যাপক। বিশ্বায়ন, সামাজিক রূপান্তর, লিঙ্গ বৈষম্য, এনজিও, জ্বালানি সম্পদ বিষয়ে তার গবেষণা কর্মের জন্যে তিনি লাভ করেছেন খ্যাতি।

অন্তর্গতভাবে মানুষ একক, অখণ্ড একটি জাতি। অর্থাৎ মানবজাতি। কিন্তু সৃষ্টির নিয়মেই তার মধ্যে কিছু বৈচিত্র আছে, পার্থক্য আছে। যেমন, গায়ের রঙ, জাতীয়তা, ধর্ম, ভাষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যা খুব স্বাভাবিক| কিন্তু এ পার্থক্যগুলোর ভিত্তিতে যদি তার সাথে বৈষম্য করা হয়, নিপীড়ন, নির্যাতন করা হয় বা তাকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে সেটা খুবই অযৌক্তিক একটি ব্যাপার। কারণ এ বৈশিষ্ট্যগুলো তার ইচ্ছানিরপেক্ষ। যেমন, একজন মানুষ কোন দেশে, কোন বর্ণে, কোন ধর্মে বা কোন ভাষা নিয়ে জন্মাবে এটা সে নিজে নির্ধারণ করে না, এটা নির্ধারিত হয়।

বৈষম্যের এই যে নানা রূপ, নানা মাত্রা- এর বিপরীতে একটি অখণ্ড মানবসমাজের ঐক্যের জন্যেই বিশ্বায়নের ধারণার উদ্ভব। বলাবাহুল্য, তাতে মানবসমাজের স্বাভাবিক বৈচিত্রপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো থাকবে। কিন্তু তারপরও তারা হবে অখণ্ড ঐক্যসমৃদ্ধ একটি মানবসমাজ। সেটা বিশ্বায়নের প্রচলিত ধারণা নয়; বরং সেটা হলো এক মানবিক বিশ্বায়ন, যেখানে একটি দেশ বাকি পৃথিবীর সঙ্গে তার শক্তি এবং দুর্বলতাগুলোর বিনিময়ের মাধ্যমে সুস্থ ভারসাম্যে পৌঁছাতে পারে। আরও আশার কথা হলো, বর্তমান পৃথিবীর যে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও সম্পদের অবস্থা- তা দিয়েই অর্জিত হতে পারে এই কাঙ্ক্ষিত বিশ্বায়ন।

আমাদের সম্পদের অভাব আছে- এ কথাটি বাংলাদেশ বা পৃথিবী- দুই ক্ষেত্রেই খুবই ভুল একটি কথা। বলা হয় পৃথিবীর ৬০০ কোটি মানুষের অর্ধেকেরও বেশি দরিদ্র। বাংলাদেশের ৭ কোটিরও বেশি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। এ দারিদ্র সম্পদের অভাবের জন্যে নয়, এ দারিদ্র সম্পদের অসম ব্যবহার এবং অসম বণ্টনের জন্যে হয়েছে। যেমন, জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচি একটি হিসেব করে দেখিয়েছিলো যে, পৃথিবীর জমি, পানি এবং প্রযুক্তি- এই তিনের ঘটিয়ে যে খাদ্য উৎপাদন করা যাবে তাতে ৬,০০০ কোটি মানুষের খাবারের সংস্থান হবে যেখানে পৃথিবীর জনসংখ্যা হলো মাত্র ৬০০ কোটি। গত ৩৪ বছরে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেড়েছে ১০০ ভাগ এবং এ সময়ে খাদ্যোৎপাদন বেড়েছে ১৭০ ভাগ। এখন বাংলাদেশে মাথাপিছু খাদ্যের উৎপাদনও বেশি। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের ৬০ ভাগ শিশু অপুষ্টির শিকার।

পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ হয় যে খাতে তা খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান চিকিৎসা বা শিক্ষা নয়, তা হলো সমরাস্ত্র এবং যুদ্ধ সরঞ্জাম। প্রতিবছর ৯০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় এ খাতে। আর এর ৬০ভাগ অর্থাৎ ৬০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে একা আমেরিকাই। তারপরও আমেরিকা প্রতিনিয়তই হুমকি মনে করে এমন সব দেশকে যারা এর ১ ভাগও খরচ করে না।

অথচ জাতিসংঘের একটি হিসেব থেকে দেখা যায়, এ খরচের মাত্র ১০০ ভাগের ১ ভাগ অর্থাৎ ৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করলেই সারা পৃথিবীর সব মানুষের জন্যে নিরাপদ পানির সংস্থান করা সম্ভব।

মাটি, পানি, খনি এবং জনসম্পদ মিলিয়ে বাংলাদেশের মতো এত সমৃদ্ধ অঞ্চল খুব কমই আছে। মাটি যদি উর্বর হয়, তাহলে তা সোনার খনির চেয়েও দামী হতে পারে। কারণ সোনার খনি তুলে ফেললেই শেষ। কিন্তু যে মাটি উর্বর তা-তো অনন্তকাল ধরে উৎপাদন দিতে থাকে। বাংলাদেশের আছে সেই মাটি।

বাংলাদেশের মতো এত সমৃদ্ধ পানিসম্পদ খুব কম দেশেই আছে। এমনকি এর বিপুল জনসংখ্যাও এর জন্যে সম্পদ হতে পারে যদি এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো হয়। কারণ মানুষ শুধু মুখ নিয়েই জন্মায় নি, এর সাথে আরো আছে তার হাত, পা এবং অমিত সম্ভাবনাময় ব্রেন। একটা কম্পিউটার নষ্ট হয়ে গেলে আমরা কত আফসোস করি কিন্তু এই কম্পিউটারের চেয়েও হাজার গুণ শক্তিশালী যে মস্তিষ্কগুলো ফুটপাতে বস্তিতে হেলায় নষ্ট হচ্ছে তা নিয়ে আমাদের ভাবনা নেই।

এগুলো তো মাটির ওপরের সম্পদ। মাটির নিচের সম্পদের মধ্যে রয়েছে গ্যাস, কয়লা। কিন্তু একটি দেশের শাসকগোষ্ঠী যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্যে কতিপয় কোম্পানি বা বিদেশি গোষ্ঠীর ক্রীড়নকের ভূমিকা গ্রহণ করে তাহলে এতসব সম্পদ বরং সে দেশের জন্যে বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশেষত সে চক্রান্ত যদি অনবায়নযোগ্য সম্পদ নিয়ে হয়। বাংলাদেশের অবস্থাও অনেকটা তা-ই।

কিছুদিন আগে একজন বিশেষজ্ঞের কাছে শুনছিলাম, পৃথিবীতে যে দুটি তেলভাণ্ডারকে কিছুই করা হয় নি তার একটি হলো আলাস্কা এবং আরেকটি হলো বঙ্গোপসাগর।

এই তেল বা গ্যাসকে যদি আমরা আমাদের কাজে ব্যবহার করি তাহলে কত কিছুই না করতে পারবো। এখন বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ নেই। গ্যাস দিয়ে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবো। কমে যাবে আমাদের উৎপাদন খরচ। কিন্তু বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে এসব সম্পদ উত্তোলন বা ব্যবহার করার সামর্থ্য আমাদের নেই। এর জন্যে বিদেশি বিনিয়োগ লাগবে, বিদেশি কনসালটেন্ট লাগবে। তারা এসে মাইলের পর মাইল কৃষিজমি নষ্ট করবে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করবে, পানি শুকিয়ে মরুভূমি বানাবে। তারপর গ্যাস বা কয়লা সব তুলে নিয়ে গিয়ে আমাদের কাছেই আবার বিক্রি করবে দ্বিগুণ, তিনগুণ বেশি দামে।

‘দাতা সংস্থা’ বা ‘বিদেশি সাহায্য’ শব্দগুলো আমাদের খুব পরিচিত। আমরা কেউ কেউ মনে করি এটা বোধ হয় হাতেম তাঈ, হাজী মুহম্মদ মুহসীন বা আর পি সাহার দান। আসলে তা নয়। ‘দাতা সংস্থা’ বলতে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংককে বোঝায়, আর ‘সাহায্য’ বলতে বোঝায় এ সংস্থাগুলোর নিজস্ব কৌশল বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশকে ঋণ দেয়া।

আর এরকম বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের নির্বিচার বাস্তবায়ন করতে গিয়েই আমাদের ওপর নেমে এসেছে আর্সেনিক নামের এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের খড়্‌গ। গভীর নলকূপ দিয়ে নির্বিচার পানি উত্তোলনের ফলে মাটির নিচে পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। আবার এখন এই আর্সেনিক সমস্যা নিয়ে চলছে তাদের হাজার কোটি টাকার নতুন নতুন প্রকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রতিযোগিতা। বলাবাহুল্য, এসব প্রকল্পের কাজ আর্সেনিক সমস্যার কারণ উদ্‌ঘাটন নয়, সমাধানও নয়। কাজ হলো নানারকম জরিপ করা আর কনসালটেন্টের লাখ লাখ টাকার বেতন গোনা।

এ প্রেক্ষাপটে মানবিক বিশ্বায়নের পথ যতই দুর্গম হোক, আমি বিশ্বাস করি সেটা অসম্ভব নয়। কারণ এ অবস্থা বদলানো যাবে না বা বাংলাদেশ পারবে না- এ ধরনের মানসিক হতাশা ও হীনম্মন্যতা থেকে আস্তে আস্তে আমরা বেরিয়ে আসছি।

মানুষের ভেতরের অমিত সম্ভাবনা এবং তার সঙ্গে সম্পদের যোগ করে যে বিপুল ক্ষমতার স্ফূরণ সম্ভব সেটা ভাবলেই বিশ্বাস হয় যে, এ পরিবর্তন অবশ্যই আমরা করতে পারবো। সকল প্রকার জাতিগত হীনম্মন্যতা ঝেড়ে ফেলে এ আত্মবিশ্বাস এবং এ স্বপ্ন দেখার প্রক্রিয়া কোয়ান্টাম ইতোমধ্যেই শুরু করেছে- এটা খুবই ইতিবাচক একটি দিক।