ভালো হওয়ার শক্তি প্রত্যেকের মাঝেই আছে

দ্বীতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হুগলি কলেজে বাবার চাকরি সুবাদে আমরা ছিলাম হুগলির শিবপুরে। যুদ্ধের ডামাডোল বেড়ে যাওয়ায় বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন বগুড়ার পৈত্রিক বাড়িতে আমাদের রেখে আসবেন। ট্রেনে চড়ে আমরা রওনা হলাম। পথিমধ্যে কিছু আমেরিকান সৈন্য উঠলো আমাদের বগিতে। আমাদের ঠিক উল্টো পাশের বেঞ্চিতে বসেছিলো এক তরুণ সৈনিক। হঠাৎ তার হাতে একটা পিঁপড়া দেখে আব্বাকে সে জিজ্ঞেস করলো, এর বাংলা কী? আব্বা বললেন, পিঁপড়া। কিন্তু বার কয়েক চেষ্টা করেও সে উচ্চারণ করতে পারছিলো না। হঠাৎ দেখলাম পিঁপড়াটাকে সে আলতো স্পর্শে নামিয়ে রাখলো পাশে যাতে এর কোনো ক্ষতি না হয়। দৃশ্যটা আমাকে দারুণভাবে নাড়া দিলো। একটা লোক কাঁধে বন্দুক নিয়ে মানুষ খুন করতে যাচ্ছে অথচ একটা ছোট পিঁপড়াকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যেও তার কত সতর্ক চেষ্টা। তার মানে প্রতিটি মানুষ ভালো মানুষ হিসেবে ভালো মন নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। খারাপ হয় সে পরিবেশ পরিস্থিতি বা প্রবৃত্তির শিকার হয়ে।
প্রতিটি মানুষই তার ভালো-মন্দ কাজের ব্যাপারে স্বধীন এবং স্রষ্টার কাছে ব্যক্তিগতভাবেই দায়বদ্ধ। এই স্বাধীনতা যদি সত্যিকারভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, যদি উপযুক্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি দেয়া যায় তাহলে তার খারাপ প্রবৃত্তি এবং প্রবণতাকেও সে দমন করতে পারবে অনেকাংশে। রাষ্ট্রব্যবস্থার রয়েছে এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আমাদের সংবিধানের ৫৯-৬০ বিধানে স্থানীয় শাসনের কথা বলা হয়েছে। সেটা যদি বাস্তবায়িত হতো অর্থাৎ ছোট ছোট এলাকাভিত্তিক গঠিত হতো একেকটি লোকাল ইউনিট বা রিপাবলিক, তাহলে সেটাই হতো সত্যিকার অর্থে জনকর্তৃত্বের সরকার। যেখানে জনগণ স্বাধীন-স্বতঃস্ফূর্ত তাদের চাওয়া-পাওয়াকে প্রতিষ্ঠা করতে পারতো।
কিছুদিন আগে কুড়িগ্রাম থেকে কিছু ছাত্র-শিক্ষক এসেছিলেন তাদের দুঃখের কথা জানানোর জন্যে। তাদের দুঃখটা এরকম- পুঁটিমারির দিকে ব্রহ্মপুত্র বাঁধের একটা জায়গা ভেঙে যাওয়ায় তা মেরামতের জন্যে ৩৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ বরাদ্দ দেয়ার সময় আমলারা আরেকটি প্রকল্প অনুমোদন করলেন- ঐ ভাঙনের জায়গায় অর্ধবৃত্তাকারে আরেকটি বিকল্প বাঁধ তৈরি করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্যা প্রতিরোধ হবে বটে কিন্তু বিনিময়ে মোট ৬টি গ্রামের মানুষকে বাস্তুহারা হতে হবে, যেখানে ছিলো তিনফসলী জমি। গ্রামবাসীদের দুঃখ এখানেই যে, নিজেদের এলাকার যে উন্নয়ন পরিকল্পনা সরকার তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে তাতে যে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতি হবে বেশি সরকারকে সেটা বোঝানোর সুযোগ তারা পাচ্ছে না। বছরের কিছুসময় বন্যাকে মেনে নিতে তাদের অসুবিধা নেই, কিন্তু বাস্তুহারা জীবিকাহারা হয়ে গেলে তাদের অস্তিত্বই তো বিপন্ন হয়ে যাবে।
স্থানীয় বিষয়গুলোর সর্বোত্তম স্বমন্বয় ছাড়াও এর আরেকটি কার্যকর দিক হলো কর্মকর্তা, নেতৃবৃন্দ এমনকি সাধারণ মানুষেরও সামাজিক দায়বদ্ধতা। যেমন, মামলা-মোকদ্দমা থেকেই একটা উদাহরণ দেই। জমিজমার মামলায় বাদী-বিবাদী দুই পক্ষেই মিথ্যা সাক্ষী পাওয়া যায়। তারা গ্রাম থেকে অনেক দূরে একটা আদালতে এসে খুব অবলীলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে আবার গ্রামে ফিরে যায়। কিন্তু আদালতটা যদি ঐ গ্রামেই হতো, তাহলে তারা আর এ সুযোগ পেতো না। কারণ তখন পরিচিত পরিমণ্ডলে নিন্দার মুখোমুখি হওয়ার ভয় থাকতো।
আমার বিচারিক জীবনে মুসলিম ব্যক্তিক আইনের কিছু রায় নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তার মধ্যে একটি ছিলো তালাকপ্রাপ্তা নারীর তার প্রাক্তন স্বামী কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়া প্রসঙ্গে। আরেকটি ছিলো ওয়ারিশদের অসিয়ত করা যাবে কি না সে প্রসঙ্গে। আর সবচেয়ে আলোচিত রায়টি ছিলো ফতোয়া বা আইনের ব্যাখ্যা দেয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তির আছে কি না সে প্রসঙ্গে। প্রথমটিতে আমি বলেছিলাম, তালাকপ্রাপ্তার তার স্বামী কাছ থেকে ভরণপোষণের অধিকার রয়েছে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বলেছিলাম, ওয়ারিশকেও অসিয়ত করা যেতে পারে, তবে প্রশ্ন থাকলে তা আদালতে ফয়সালা হতে পারে। আর তৃতীয় ক্ষেত্রে বলেছিলাম যে, ফতোয়া দেয়ার অধিকার আদালতের, কোনো ব্যক্তির নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমি রায় দিতে চেষ্টা করেছি কোরআন-হাদিসের সঠিক বর্ণনারীতিকে অনুসরণ করে। কিন্তু যুক্তিগ্রাহ্যতা বা স্বভাবিক মানবিকতা বিবেচনার বদলে রায়গুলো সম্মুখীন হয়েছে উগ্র আবেগ বা একদেশদর্শী সমালোচনার।
অন্যের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারকে আমি যেমন সবসময় সম্মান করেছি, নিজের স্বাধীন মত প্রকাশ করতে গিয়েও কোনো ভয়-হুমকি-ধামকির মুখে বিচলিত হই নি। ফতোয়া সংক্রান্ত রায়টির পর (যদিও আপিল বিভাগে তা বিবেচনাধীন আছে) আমার প্রতি নানারকম হুমকি এসেছে, ভুয়া বোমার প্যাকেট ফেলে রাখা হয়েছে আমার বাড়িতে। প্রশাসন থেকে বিশেষ নিরাপত্তা পুলিশ দিতে চেয়েছে। কিন্তু আমি সম্মতি দেই নি।
মানুষের এই স্বাধীন সত্তা হরণের আরেকটি উদাহরণ হলো বিশ্বায়ন। এখন পণ্যের প্রসার নির্ভর করে তার কার্যকারিতার ওপরে নয়, কত সুন্দরী বা জনপ্রিয় তারকা এর মডেল হলেন তার ওপর। কিছু নারী তাদের সৌন্দর্যকে বানিয়েছে পণ্য। বিশ্বব্যাংক বা দাতাগোষ্ঠীগুলো সাহায্যও করে তাদের স্বার্থরক্ষার জন্যে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিশ্বব্যাংক অঢেল অর্থ দিলো রাস্তা তৈরি করার জন্যে। আমরা রাস্তা করলাম। ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিলাম যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ এবং সুলভ মাধ্যম রেল-ব্যবস্থাকে। বিনিময়ে রাস্তা তৈরির পর তাদের বাস-ট্রাক-গাড়ি আমদানির পথই সুগম হলো।
আমরা সমস্যার সার্বিক বা স্বমন্বিত সমাধান না করে আংশিক সমাধানের পেছনে ছুটি। আমাদের এখানে দুর্নীতি হয়, মানুষ ঘুষ খায়। কারণ বিপুল অর্থ দিয়ে কেনার মতো প্রচুর পণ্য বাজারে রয়েছে। একটা পিৎজার দাম যদি আড়াই হাজার টাকা বা একটা পারফিউমের দাম যদি সাত হাজার টাকা হয়, সেটা কেনার জন্যেও অবশ্যই কিছু মানুষ তৈরি হবে যারা প্রলুব্ধ হবে অবৈধ উপার্জনের পথে। এর সবকিছুর পেছনেই আছে পুঁজিবাদী চক্রের হাত।
এ বিষয়গুলোতেই এখন আমাদের সচেতনতা দরকার। ব্যক্তি থেকে জাতি সব পর্যায়েই প্রয়োজন আর অপ্রয়োজনের মধ্যে সীমা নির্ধারণ করা দরকার। কোরআন অনুসারে এই প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের সীমাটা খুব সহজবোধ্য একটি ব্যাপার। আর তাহলেই ব্যক্তিগত এবং জাতিগতভাবে আমরা আবার প্রতিষ্ঠিত হতে পারবো একটি সফল, সমৃদ্ধ এবং সার্বজনীন শক্তি হিসেবে।