বিদেশি অনুদানের প্রত্যাশা জাতিকে করে মানসিক প্রতিবন্ধী

আজ থেকে প্রায় ৭৫ বছর আগের কথা। একজন প্রকৌশলী পাস করার পর পরই যোগ দিলেন সরকারি কর্মকর্তা পদে আর কাঁধে নিলেন বাংলাদেশের একমাত্র ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের গুরু দায়িত্ব। তার স্কুলপড়ুয়া ছেলেটিকে ‘বড় হয়ে কী হতে চাও’ প্রশ্ন করলে সোজা-সাপ্টা জবাব দিতো ‘ইঞ্জিনিয়ার হবো!’ দিন-মাস-বছর পেরিয়ে সে ছেলেটিকে দেশবাসী চিনলো ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী হিসেবে।
আমার জন্ম সিলেটে হলেও পড়াশোনার সুবাদে বেড়ে উঠেছি ঢাকায়। কলেজ পাশের পর ভর্তি হলাম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) এবং সেখানেই ১৯৬০ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলাম। ১৯৬৪ সালে অয়েল কোম্পানি- বার্মা শেল-এর স্পন্সরে স্কলারশিপ নিয়ে গেলাম ইংল্যান্ডে উচ্চতর শিক্ষার জন্যে।
১৯৬৮ সালের নভেম্বরে পিএইচডি করার পর ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলো। আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার অফার উপেক্ষা করে দেশে ফিরে আবারও যোগ দিলাম বুয়েটে প্রভাষক হিসেবে। কারণ আমার সবসময় মনে হতো এ জীবনে যদি কিছু দিয়ে যেতে পারি তা আমার মাতৃভূমিকেই দেবো। বিশেষজ্ঞদের প্রবাসী হওয়ার ক্ষেত্রে একটা কথা বলা হয় যে, বাংলাদেশে কাজ করলে প্রফেশনাল স্যাটিসফেকশন আসে না। কিন্তু আমি বলি, বাংলাদেশে থেকে আমি যত ধরনের প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, মনে হয় না বিদেশে গেলে কেউ এ সুযোগ পেতো।
শিক্ষকতার পাশাপাশি দেশে-বিদেশে সরকারি, বেসরকারি- বিভিন্ন প্রকল্পে কখনো উপদেষ্টা, কখনো চেয়ারম্যান আবার কখনো পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছি। আমি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি ছিলাম পর পর ৩ বছর। ১৯৭২ সালের ১২ নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস যাকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে ধরা হয়, সেসময় সহকর্মী ও ছাত্রদের নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সাইক্লোন শেল্টার স্থাপনের কাজে ঘুরেছি টেকনাফ থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিমে শ্যামনগর, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলা এবং হাতিয়া, সন্দ্বীপ, মনপুরাসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে।
বাংলাদেশের এলাকাভিত্তিক ভূমিকম্পের ঝুঁকি নির্ণয়ের তথ্য সংগ্রহের প্রথম উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করি। আমার পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিলো উচ্চ ইমারত ডিজাইন। দেশে এসে টল বিল্ডিং ডিজাইনিং-এর ক্ষেত্রে কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহারে কিছু অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছি। ফলে ডিজাইনিং-এর ক্ষেত্রে এখন এসেছে অনেক বৈচিত্র এবং স্বাচ্ছ্যন্দের সুযোগ।
আসলে প্রত্যেকে যদি নিজ অবস্থানে ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে তাহলেই উন্নয়নের স্রোত ব্যক্তিগত পর্যায়ে বইতে শুরু করবে। কোয়ান্টামের কর্মপ্রক্রিয়ায় এ বিষয়টিই লক্ষণীয়। কোয়ান্টাম আত্ম উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে প্রতিটি মানুষকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করে তার জীবনের দুর্দশার শৃঙ্খল ভাঙতে সাহায্য করছে।
বিদেশি অনুদান ও সিদ্ধান্তহীনতা আমাদের জাতিগত উন্নয়নের দুটি বড় প্রতিবন্ধকতা। আমরা দ্রুত চূড়ান্ত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আর এর সঙ্গে রয়েছে বিদেশি সাহায্যের আশায় বসে থাকার মানসিক প্রতিবন্ধকতা। অথচ স্ব-অর্থায়নে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করলে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের নিয়েই আমরা চমৎকারভাবে এগুতে পারি।
এ প্রসঙ্গে আমার পেশাগত জীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি- আরিচা-নগরবাড়িতে নদীর ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ ট্রান্সমিশন টাওয়ার বসানোর প্রজেক্ট ডিজাইনটি পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড পুনরায় পরীক্ষা করার জন্যে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ খুঁজতে লাগলো। বিদেশি ডিজাইনাররা পিডিবিকে খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললো, তোমাদের দেশে কি এরকম ডিজাইন চেক করার লোক আছে? সব শুনে আমরাও বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলাম। পরীক্ষায় তাদের ডিজাইনে- বিশেষ করে টাওয়ারের ফাউন্ডেশনে- কিছু ভুল ধরা পড়লো।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের জলোচ্ছ্বাসের পর সরকার ইউএনডিপি-কে সাইক্লোন শেল্টারের মাস্টার প্ল্যান করে দেয়ার প্রস্তাব করলো। ইউএনডিপি প্রস্তাবে রাজি হয়ে ২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করে বিদেশি বিশেষজ্ঞ পাঠানোর উদ্যোগ নিলো। তখন বাংলাদেশ সরকার ইউএনডিপিকে বেশ কাঠখড় পুড়িয়েই বোঝালো যে, বাংলাদেশেই অভিজ্ঞরা রয়েছেন এ কাজের জন্যে। তখন বুয়েট এবং বিড্স-এর যৌথ সহযোগিতায় বিশেষজ্ঞ দল যে মাস্টার প্ল্যান তৈরি করলেন তাতে অবিশ্বাস্যভাবে বাজেটের এক-চতুর্থাংশ ব্যয় হয়। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও সে প্রতিবেদন ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।
আমার প্রকৌশলী জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি অধ্যায় ছিলো যমুনা সেতু। নির্মাণশৈলী থেকে শুরু করে সেতুর স্থান নির্বাচন, আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ- সব মিলিয়ে এটি ছিলো পৃথিবীর অন্যতম চ্যালেঞ্জিং একটি সেতু প্রকল্প। এর প্রাথমিক ও মূল নকশা তৈরি, কনস্ট্রাকশন সুপারভাইজ করাসহ নির্মাণের ২/৩ বছর পর পর্যন্ত নির্মাতাদের বাড়তি মজুরির দাবি নিষ্পত্তি- সব মিলিয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি যে, এত দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার সুযোগ আমি পেয়েছিলাম।
নিজেকে কখনোই সফল মনে করি না। কিন্তু আমি সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ, যা অর্জন করেছি সেজন্যে। তবে যখন যে কাজ করেছি নিষ্ঠার সাথে করার চেষ্টা করেছি। সবসময় দায়িত্ব সচেতন থেকেছি।
গণিতকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা শুরু করেছি গণিত অলিম্পিয়াডের অভিযাত্রা। উদ্বুদ্ধ করছি শিক্ষার্থীদের, ২০২০ সাল নাগাদ গণিতে সর্বোচ্চ সম্মাননা ফিল্স মেডেল যেন বাংলাদেশের ঘরে আসে সে লক্ষ্যে কাজ করতে। আর ২০৩০ সালের মধ্যে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার অর্জনের টার্গেটও বেঁধে দিয়েছি আমরা ছাত্রছাত্রীদের।
শুধু গণিত বা বিজ্ঞানে নয়, আমি স্বপ্ন দেখি আত্মবিশ্বাসী এক তরুণ প্রজন্মের যারা জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বের দরবারে একটি সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে পরিচিত করাবে। সমৃদ্ধ স্বাদেশের সে স্বপ্ন প্রতিটি তরুণ হৃদয়ে বুনে দেয়ার জন্যেই হোক আমাদের এখনকার সকল কর্মপ্রচেষ্টা। [কোয়ান্টাম মুক্ত আলোচনায় প্রদত্ত ভাষণের অনুলিখন]