পরিবর্তনের জন্যে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য

দেশের অবস্থা কী’- এ প্রশ্নের উত্তরে এক রিকশাচালক বলছিলেন, ‘আর বইলেন না ভাই, খুব খারাপ অবস্থা, রাজনীতির মধ্যেও পলিটিক্স ঢুইকা গেছে।’ কথাটার অর্থ হয়তো ভুল কিন্তু এর আবেদনটা দেশের সাধারণ জনগণ সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য। কি সমাজনীতি, কি অর্থনীতি- সবই এই পলিটিক্সে জর্জরিত।
রাজনৈতিক দলগুলোর একটা প্রচলিত স্লোগান হচ্ছে- জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস। অথচ জনগণ কী চায় তা না জেনেই তারা ভাষণের পর ভাষণ দিয়ে যান। তারা থাকেন বাঁশের বেড়া দেয়া পৃথক মঞ্চে, জনতার কাছাকাছি আসতে পারেন না। তাই জনগণের চাওয়াও তাদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছে না।
সমাজের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের এসব কথাকে সবার সামনে তুলে ধরতে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে আমরা একটি উদ্যোগ নিয়েছি। দেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত সব এলাকায় আমরা যাচ্ছি। সেখানকার কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক থেকে শুরু করে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের কথা শুনছি, বুঝতে চেষ্টা করছি তাদের চাওয়াগুলোকে। এগুলোর আলোকে আমরা এরপর তৈরি করবো আমাদের প্রস্তাবনা।
বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে আমরা পরিণত হয়েছি বিভিন্ন বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর ক্রীড়নকে। অথচ যে সম্মান আমরা তাদের দেই তার কানাকড়িও আমরা দেই না আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশিদের, যাদের উপার্জনের ৯৬০ কোটি ডলার আমরা পেয়েছি গত অর্থ-বছরে যা জাতীয় আয়ের ১২%। যদিও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থকেও আমরা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করতে পারি নি।
যদি আমরা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চাই তাহলে বিনিয়োগ করতে হবে। এটা হতে পারে দেশি অথবা বিদেশি। জাতীয় আয়ের এক চতুর্থাংশ বিনিয়োগ করে আমরা প্রবৃদ্ধি পাই ৫.৩%। অথচ অর্থনীতিবিদদের মতে, আমাদের পাওয়া উচিত ৮.৫%। কারণ অনেকগুলো, হয় তথ্য ভুল অথবা তথ্য ঠিক আছে কিন্তু চুরি হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া অদক্ষতা হতে পারে, হতে পারে বিনিয়োগের যথাযথ ক্ষেত্রের অভাব।
বিদেশি বিনিয়োগ শুনলেই আমরা কেউ কেউ উল্লসিত হয়ে উঠি। কিন্তু টেলিকমিউনিকেশন বা মোবাইল ফোনের মতো খাতে অল্প বিনিয়োগ করে রাতারাতি কাঁড়ি কাঁড়ি মুনাফা বিদেশি কোম্পানি হাতিয়ে নিলে দেশের কোনো লাভ হয় না।
বিনিয়োগের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো শক্তি সম্পদের পর্যাপ্ততা। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে আমাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ যথেষ্ট নয়। এছাড়া গ্যাস যে হারে ব্যবহার হচ্ছে তা বজায় থাকলে আগামী ১৫ বছর পর আমাদের গ্যাসভাণ্ডার শূন্য হবে। তারপর কী হবে কেউ জানি না। কারণ একটাই- তাৎক্ষণিকতাদুষ্ট ব্যবস্থাপনা।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতির নিয়ামক শক্তিগুলো তৃতীয় বিশ্বের ওপর চালাচ্ছে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আন্তর্জাতিক বিশ্বের কূটনীতি হচ্ছে একের পর এক প্রকল্পে তারা তৃতীয় বিশ্বকে মাতিয়ে রাখে। যেমন ’৭০-এর দশকে শুরু হলো বাজার অর্থনীতি। ’৭২-এ বলা হলো অর্থ নয়, পরিবেশই সব। ’৮০-তে তাদের মুখে শোনা গেল, যা কিছু পারো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে রেখে যাও। ’৯২-এ এলো টেকসই উন্নয়নের ধারণা। ’৯৫-এ ২০:২০ কনট্রাক্ট। জাতীয় বাজেট থেকে ২০% রাখা হলো সামাজিক অবকাঠামো বিনির্মাণে।
এদিকে ২০০০ সালে প্রকল্পের মাত্রা গেল বদলে, দারিদ্র পেলো প্রাধান্য। শুরু হলো মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট, তারপর এলো পার্টনারশিপ ফর ডেভেলপমেন্ট। অর্থাৎ একদিকে বলছে টাকা দেবো, আবার বলছে অংশীদারিত্ব কর। সামপ্রতিক যে প্রকল্প বাংলাদেশে চলছে তা হলো- এইড ফর ট্রেড। বাণিজ্য কর, সাহায্য পাবে। অর্থাৎ একেকবার একেক রকম কথা।
বাংলাদেশের উন্নতি হচ্ছে না- কথাটা ঠিক নয়। উন্নতি হচ্ছে কিন্তু তা চলে যাচ্ছে মাত্র কয়েকজনের পকেটে। সরকারি এক হিসেবে দেখা যায়, ’৯১-’৯২ সালে সবচেয়ে দরিদ্রের তুলনায় সবচেয়ে ধনীর আয় ছিলো ১৮ গুণ বেশি। মাত্র ৫ বছর পর সেটা হয় ২৭ গুণ। ২০০০-এ ৪৬ গুণ এবং ২০০৫-এ এসে হলো ৮৪ গুণ। কী অবিশ্বাস্য পরিমাণ বৈষম্য নিয়ে চলছে আমাদের সমাজ!
একটা সময় ছিলো যখন কেউ যদি সুদ-ঘুষ খেতো, লোকজন তার সঙ্গ এড়িয়ে চলতো। আর এখন কে অনেক টাকার মালিক- এটাই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। টাকার উৎসটা বৈধ না অবৈধ সেটা কোনো ব্যাপার নয়। যদি আপনি ঘুষ না খান তাহলে অফিসের সবাই মনে করবে আপনি গোলমেলে লোক, আপনাকে সরাতে হবে- এটাই আজকের বাস্তবতা।
এ বাস্তবতা বদলানোর জন্যে দরকার লক্ষ্য। বাংলাদেশে আমরা কোনোদিন কোনো লক্ষ্য স্থির করি নি। ঠিক করি নি যে, আজ থেকে ২০/২৫/৩০ বছর পর আমরা কোথায় যেতে চাই। আমরা যদি আজ থেকে ২০ বছর পর এমন একটা সমাজ চাই যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, সবার জন্যে থাকবে সমান সুযোগ। অজ-পাড়াগাঁয়ের একজন ছেলেও যদি বিজ্ঞানী হতে চায় বা কৃষিবিদ হতে চায়- সে সুযোগ সে পাবে। অর্থনীতি হবে সজীব ও সচল এবং রাজনীতি হবে অংশীদারিত্বমূলক গণতান্ত্রিক। হয়তো সবক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না, কিন্তু আমাদের চেষ্টা থাকবে।
এখন এ লক্ষ্য অর্জনের জন্যে যে কয়টি পথের কথা বলা যায়, তার একটি হলো শিক্ষা। কিন্তু আমাদের শিক্ষার মান খুবই নিচু। শিক্ষার প্রধান যে দুটো দিক- নৈতিকতা এবং দক্ষতা- এ দুটোরই প্রকট অভাব আমাদের শিক্ষায়। WHO বলে, মাথাপিছু বার্ষিক ৩৬ ডলার খরচ করলে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যব্যবস্থা পাওয়া যায়। অপরদিকে স্বাস্থ্যখাতে আমাদের মাথাপিছু গড় ব্যয় মাত্র ৪ ডলার।
এতসব নেতিবাচক বাস্তবতার মধ্যেও এখন আমাদেরকেই হাল ধরতে হবে। পরিবর্তনের আন্দোলনের সূচনা করতে হবে। যে আন্দোলনের হাতিয়ার লাঠিসোঁটা বা গুলি-বন্দুক নয়; সে আন্দোলনের হাতিয়ার করতে হবে নতুন চিন্তা, নতুন ধারণা, পারস্পরিক মমতা ও ভালবাসাকে। তাহলেই আসবে কাঙ্ক্ষিত সে পরিবর্তন।