নিয়মিত মেডিটেশন জীবনে আনে ইতিবাচক পরিবর্তন

তখন আমি লন্ডন গিল্ড হল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করি। দেখলাম লন্ডনে ব্যাঙের ছাতার মতো ইউনিভার্সিটি হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে দেখেছি উন্নয়নশীল দেশের ছেলে-মেয়েরা লন্ডনে আসে পড়াশোনার জন্যে। কিন্তু তাদের দুর্দশার কোনো শেষ থাকে না। আমি এবং আজিজুর রহমান সাহেব, এখন যিনি আইকন কলেজের ডিরেক্টর, একসাথে মিলে চাইলাম সুবিধাবঞ্চিত কমিউনিটির জন্যে কিছু করতে। পরিকল্পনা ছিলো ভোকেশনাল স্কিলভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার। কারণ আমরা দেখেছি উন্নয়নশীল দেশের ছাত্রছাত্রীদের ভোকেশনাল স্কিলের ঘাটতিটাই প্রকট থাকে।
২০০৪ সালে আমরা লন্ডনে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিই। কলেজ শুরু করার অনুমতি নিতে সময় লেগেছিলো তিন মাস। এরপর বিজ্ঞাপন পর্ব এবং ১/২/৩ জন করে ছাত্রছাত্রীর ভর্তি হওয়া। পূর্ব লন্ডনের ই-১ এডলার স্ট্রিটে শুরু হলো আইকন কলেজ অফ টেকনোলজি এন্ড ম্যানেজমেন্টের যাত্রা। প্রথমে ছাত্রসংখ্যা ছিলো মাত্র ২০ জন। এদের মধ্যে ১২ জনই পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সুযোগ পায় এবং লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটি থেকে সাফল্যের সাথে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে।
২০০৬ সালে গুরুজী কোয়ান্টাম মেথড কোর্স করানোর জন্যে দ্বিতীয়বারের মতো লন্ডন আসেন। সে কোর্সটি অনুষ্ঠিত হয় আইকন কলেজ মিলনায়তনে। সেসময়ে তিনি একটি কথা বলেছিলেন যে, আইকন কলেজের উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটবে। আজ সত্যিই তা-ই হয়েছে। আইকন কলেজের ছাত্রসংখ্যা এখন ৭ শতাধিক। কলেজের জন্যে এখন আরও বেশি ক্লাসরুম এবং জায়গার প্রয়োজন।
এ সাফল্যের মূল কারণ হলো শিক্ষার গুণগত মানের ব্যাপারে আমরা সবসময় আন্তরিক ও সৎ সেবা দেয়ার চেষ্টা করেছি। ছাত্রভর্তির ক্ষেত্রে যেমন মান বজায় রাখার চেষ্টা করেছি ফ্যাকাল্টি বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও আমরা সবসময় গুরুত্ব দিয়েছি ভালো ও যোগ্য শিক্ষক।
কলেজ শুরু করার পর আমরা প্রথমে হায়ার ন্যাশনাল ডিপ্লোমা (HND) কোর্স চালু করলাম এবং তা ছিলো শুধুমাত্র ব্যবসায় শিক্ষা এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে। এখন এ কোর্স আমরা ট্রাভেল এন্ড টুরিজমসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর শুরু করেছি। শুধু তা-ই নয়, আমাদের কলেজে এখন আমরা পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা (PGDNS) কোর্সও চালু করেছি। দুটো মাত্র কোর্স দিয়ে যে আইকন কলেজ যাত্রা শুরু করেছিলো সেখানে এখন কোর্সের সংখ্যা ৭টি।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে আইকন কলেজ একটি ভালো কলেজ হিসেবে স্বীকৃত| প্রচুর বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রী এখানে রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত পাকিস্তান মালয়েশিয়া থাইল্যান্ড মায়ানমার নেপাল শ্রীলঙ্কা ঘানা ও নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রী এখন আমাদের এখানে পড়াশোনা করছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বোর্ড (EdExcel) আইকন কলেজকে ডিএমএস এবং এইচএন্ডডি ডিগ্রি প্রদানের অনুমতি দিয়েছে। EdExcel আমাদের কার্যক্রম নিয়ে সন্তুষ্ট। বাংলাদেশসহ ভারত পাকিস্তান শ্রীলংকা ও নেপালে আইকন কলেজের আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। বর্তমানে আইকন কলেজ থেকে বাংলাদেশি ছাত্রদের জন্যে স্কলারশিপও দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে আমরা কোর্স ফি-ও অনেক কম রাখি। HND কোর্স সম্পন্ন করতে টিউশন ফি প্রয়োজন হয় মাত্র ৩,৫০০ পাউন্ড। আমাদের ফুলটাইম কোর্স যেমন আছে তেমনি কর্মজীবী ছাত্রছাত্রীদের সুবিধা বিবেচনায় ইভিনিং এবং উইকএন্ড কোর্স আছে, আছে ফ্লেক্সিবল ক্লাস আওয়ারের সুযোগ। আইকন কলেজের মূল লক্ষ্য হলো উন্নয়নশীল দেশের ছেলে-মেয়েদেরকে লন্ডনে পড়াশোনা করতে সাহায্য করা।
সমপ্রতি বাংলাদেশে আইকন কলেজের আঞ্চলিক কার্যালয় চালু করা হয়েছে। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির সাথে আইকন কলেজের কোলাবোরেশন রয়েছে। দুবছর আইকন কলেজে পড়ার পর শেষ বছর তারা সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতে পারে। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা বিআইটি ম্যানেজমেন্ট এবং মোবাইল কমার্স বিষয়ে এমএসসি ডিগ্রিও নিতে পারবেন সেখান থেকে। আইকন কলেজ বর্তমানে নর্থাম্ব্রিয়া ইউনিভার্সিটির এলএলবি অনার্সের ওপেন লার্নিং প্রোগ্রামের একমাত্র পরীক্ষা কেন্দ্র। কলেজের একজন ছাত্র ২০০৭ সালে সেরা মেডিকেল ল’ স্টুডেন্ট হিসেবে লাভ করে নর্থ অফ ইংল্যান্ড মেডিকো লিগাল সোসাইটি স্পেশাল প্রাইজ।
কোয়ান্টাম মেথড কোর্সে অংশ নেয়ার পর আমার দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনযাপনসহ সবকিছুতেই বিশাল পরিবর্তন এসেছে। আগে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপজনিত কিছু সমস্যা ছিলো আমার। ২০০৬ সালে কোর্স করার পর থেকে আমার এসব কোনো সমস্যাই নেই। ৫৮ বছর বয়সেও সপ্তাহের সাতদিনই ১২ ঘণ্টা করে কাজ করি। মেডিটেশন আমার মধ্যে এ প্রাণশক্তি সঞ্চার করেছে। এখন পর্যন্ত ৪৮টি দেশ ভ্রমণ করেছি। প্লেনে ভ্রমণের সময়ও মেডিটেশন করি। মেডিটেশন আমার মনের শক্তি, একাগ্রতা ও উদ্যম সবসময় বাড়িয়ে দেয়।
প্রত্যেকেরই প্রতিদিন মেডিটেশন করা উচিত। যে মানুষ নিয়মিত মেডিটেশন করে তার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। গুরুজীর কাছে আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ যে, তিনি কোয়ান্টাম মেথড মেডিটেশনকে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
আইকন কলেজ কোয়ান্টাম মেডিটেশন সোসাইটির কার্যক্রমের জন্যে সবসময় উন্মুক্ত। গুরুজীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর পাশাপাশি কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের কর্মীদের জন্যে আন্তরিক শুভকামনা করি যাতে মানুষের কল্যাণার্থে তারা আজীবন কাজ করে যেতে পারেন।