ধ্যানের তাৎপর্য

Bangla
জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান
জাতীয় অধ্যাপক বিশিষ্ট সাহিত্যিক মরহুম সৈয়দ আলী আহসান। সাবেক ভিসি, জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন

আমি দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে ঠিক বেরোই না। শারীরিক অস্বাচ্ছন্দ্য আছে। তাছাড়া আমার নিজের কর্মব্যস্ততাও আছে। বই লেখা, কাজ করা। জীবনের শেষ প্রান্তে এলে যা কিছু করার থাকে, দেবার থাকে, সেগুলো দেবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে ওঠে মানুষ। আমিও সেজন্যে খুব ব্যস্ত হয়ে উঠেছি। সুতরাং আমি নিজের জন্যে অবসর নির্মাণ করতে পারি না। তাছাড়া অবসরের চাইতে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে নিজের জন্যে একটি নির্জনতা সৃষ্টি করা। প্রত্যেক মানুষ অসম্ভব ব্যস্ততার মধ্যে পৃথিবীতে থাকে, কোলাহলের মধ্যে থাকে। কিন্তু নির্জনতার জন্যে সে তো গুহার মধ্যে যেতে পারে না। সুতরাং এ কোলাহল ও ব্যস্ততার মধ্যে থেকেই মানুষকে নির্জনতা আবিষ্কার করতে হয়।

বিখ্যাত ফরাসি আধুনিক কবি পীয়েরে ইমেনুয়েলের সঙ্গে আমার খুব ঘনিষ্ঠতা ছিলো। তিনি প্যারিসে তাঁর বাসায় একবার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি নিজেকে কখন আপন করে পাও?” অন্য প্রসঙ্গ থেকে হঠাৎ এ প্রশ্ন করাতে আমি একটু অসুবিধা বোধ করলাম। তারপর তিনি নিজেই বললেন, “দেখ আমি সবসময় এই প্যারিসে থাকি, প্যারিসের পথ দিয়ে হাঁটি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাই। কিন্তু তুমি বিশ্বাস করবে না যে আমি পথ দিয়ে যাওয়ার সময় পথের মানুষের শব্দ শুনি না, অনুষ্ঠানে গিয়ে অনুষ্ঠানের দৃশ্য দেখি না এবং কর্মব্যস্ততার মধ্যে কর্মের যে আন্দোলন সেগুলোও অনুভব করি না। আমি সব সময় নিজেকেই অনুভব করি”। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম এটা কিভাবে সম্ভব? জবাবে তিনি বললেন, “মানুষ যদি চিত্তের মধ্যে একাগ্রতা নির্মাণ করতে পারে তাহলেই সেটা সম্ভবপর”।

আরেকজন বিখ্যাত ফরাসি লেখক রোজেক আইওয়া। এক নিমন্ত্রণে তাঁর বাসায় গিয়ে দেখি তাঁর ঘরগুলো সব পাথরে ভর্তি। টুকরো টুকরো পাথর। নানা রঙের পাথর। বিচিত্র রকমের পাথর ছড়ানো ছিটানো রয়েছে চারদিকে। শুধু পাথর আর পাথর। সে এক অসম্ভব ব্যাপার। অর্থাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে দামী যে পাথর তারও নিদর্শন সেখানে আছে; সাগর তীরের যে নুড়ি, তারও নিদর্শন সেখানে আছে। এর ওপর তাঁর একটি কবিতার বইও আছে। সবকিছু ঘুরে ফিরে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি এতে কী আনন্দ পান। তিনি জানালেন “সবচেয়ে নির্জন হলো পাথর আর মানুষ সবচেয়ে কোলাহলমুখর। পাথর যেহেতু নির্জন সেহেতু পাথর কী বলতে চায় তা আমরা জানি না। পাথর আমাদের দিকে তাকায়, পাথর স্তব্ধ হয়ে থাকে। সে স্তব্ধতার মাঝেও যেন সব কথা পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। অসম্ভব নীল একটি পাথর দেখলে কি তোমার মনে হয় না যে এর মধ্যে পৃথিবীর আনন্দ, উচ্ছলতা একেবারে জমাট বেঁধে আছে? অথবা একটি লাল পাথরের মাঝেও কি তুমি আবেগ ও উত্তেজনার সংক্রমণ লক্ষ্য কর না? এ কারণে আমি পাথর সংগ্রহ করেছি পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে।”

মানুষকে সবসময় কোথাও না কোথাও অনুসন্ধান করতে হবে একটি নির্জনতাকে। এ নির্জনতা মানুষকে কর্মব্যস্ততার মধ্যে, কোলাহলের মধ্যেই আবিষ্কার করতে হবে। অধিকাংশ সময়ে লক্ষ্য করি, আমরা কিন্তু নির্জনতা কামনা করি না। আমরা পাগল হয়ে যাই নির্জন অবস্থায় থাকলে। মনে করি এ নির্জনতা বোধ হয় আমার অসুবিধা সৃষ্টি করছে। সুতরাং মানুষের সঙ্গ পাবার জন্যে ছুটে যাই।

আমি একবার দুসেলডর্ফে একটি হোটেলে এক ঘরে একা ছিলাম রাত্রি বেলা। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম হয় নি। ঘুম হচ্ছে না দেখে গোসল করে নিলাম। গোসল করেই মনে হলো আমার বোধ হয় মৃত্যু এগিয়ে আসছে। সুতরাং দরজাটা খুলে দিলাম। দরজা খুলে দেবার পর হোটেলের প্রহরী এসে উপস্থিত। সে বললো, “দরজা খুলেছেন কেন? বন্ধ করুন”। আমি বললাম, “বাইরে যাবো”। সে তখন দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে বললো। বাইরে বেরিয়ে দেখি কোথাও কেউ নেই। তখন গরমের সময় হলেও রাত্রে বেশ শীত। আমি হাঁটতে বেরোলাম। তখন আমার মনে হলো ঘরে যে একাকিত্ব আর বাইরের প্রকৃতির যে একাকিত্ব- এ দুয়ের মাঝে আকাশ-পাতাল তফাত। প্রকৃতি সত্যিই মানুষকে সান্ত্বনা দেয়, মানুষকে স্পর্শ করে। ঘরে পোশাক-পরিচ্ছদ, সাজ-সজ্জা, চেয়ার-টেবিল ইত্যাদি কোলাহল সৃষ্টি করে। সেজন্যে ঘরের নির্জনতাও আমাদের কাছে নির্জনতা বলে অনুভূত হয় না। আমি সেই নির্জনতাকে অনুভব করতে পারি নি ঘরের মধ্যে। তবে বাইরে ভীড়ের মধ্যে আমি নির্জনতাকে অনুভব করতে পেরেছি।

আমার একটি বই আছে, নাম ‘উচ্চারণ’। তার মধ্যে আমার বিভিন্ন সময়ের চিন্তাগুলো লিপিবদ্ধ আছে। সেখানে এক জায়গায় লিখেছিলাম যে, মানুষ কখন কোথায় নিজেকে পায়? নদীতীরে পায়, সমুদ্রতীরে পায়, পাহাড়ের গুহায় পায়, না লোকালয়ের মধ্যে পায়? আমি বহুবার চেষ্টা করেছি উত্তর পেতে। কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর আমি পাই নি। আমি বহু সমুদ্রতীরে গিয়েছি। সমুদ্রের প্রতি আমার এ আকর্ষণ বহুদিনের। আটলান্টিকের তীরে গিয়েছি। ব্রাজিলের কোপা-কাপানা বিচে আমি গিয়েছি। সেখানে তন্ময় হয়ে সমুদ্রকে দেখবার চেষ্টা করেছি।

আগের দিনে মানুষ নির্জনতার সন্ধানে গুহায় চলে যেতো। গৌতমবুদ্ধ গৃহত্যাগী হয়েছিলেন। মানুষের বার্ধক্য ও জরা-মৃত্যু দর্শনে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিলো এ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণের উদ্দেশ্য কী? আমাদের জন্ম কি বার্ধক্য পাবার জন্যে, অসুস্থতা ভোগ করে মৃত্যুতে গত হবার জন্যে? পৃথিবীতে আসার উদ্দেশ্য কী? এসব প্রশ্নের জবাব পাবার জন্যে তিনি গৃহে যুবতী স্ত্রী এবং পুত্রসন্তান রেখে পথে বেরিয়ে পড়লেন। মুকুট ফেলে দিয়ে গেরুয়া বসন ধারণ করলেন। নানাভাবে কঠোর তপস্যা করলেন। কিন্তু কঠোর তপস্যায় তাঁর শান্তি হলো না। তখন সম্পূর্ণ নির্জনতার মাঝে তিনি চলে গেলেন। পরবর্তীতে সে নির্জনতাকে প্রমাণ করার জন্যে তিনি লোকালয়ে ফিরে এলেন। সকলে তাঁর দিকে তাকিয়ে অবাক। যে পাঁচজন সন্ন্যাসীর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিলো তারা গৌতম বুদ্ধের ফিরে আসা সম্পর্কে আলোচনা করছিলো। আনার কলম, উদ্ধালক এবং আরো কয়েকজন। এদের একজন বললো, “ও যখন বেরিয়ে আসবে তখন আমি ওর দিকে তাকাবো না, আকাশের দিকে তাকাবো”। আরেকজন বললো, “ও যখন বেরিয়ে আসবে তখন আমি বসে থাকবো”। অন্যজন জানালো সে বুদ্ধের আগমনে পিছন ফিরে থাকবে। কিন্তু গৌতম বুদ্ধ যখন বেরিয়ে এলেন তখন সবাই উঠে দাঁড়ালো। তখন একজন বললো, “ভিক্ষু, তোমার দৃষ্টি, তোমার শরীর এত মধুর”। বুদ্ধ তাকে কিছু বললেন না। একাকিত্বকে তিনি উপার্জন করেছেন এবং সমস্ত মানুষ তাঁর একাকিত্বকে লক্ষ্য করেছে।

রীস জেভিস আমাদের পয়গম্বর রাসূলে খোদা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে গৌতম বুদ্ধের জীবনের একটি তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “গৌতম বুদ্ধের জীবনের প্রথম দিকে সাধনার পর্যায় পর্যন্ত, সিদ্ধিলাভ পর্যন্ত রাসূলের (সা.) জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। তিনি দীর্ঘ সময় মানুষের মধ্যে, বহু ঘটনার কোলাহলের মধ্যে থেকেও তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন। যে হেরা গুহায় তিনি সাধনা করতেন অনেকেই সেটি দেখেছেন। সেখানে, সে সময়ে মক্কা শহর থেকে, জনপদ থেকে দূরে, অনেক বিপদসঙ্কুল পথ পেরিয়ে, সেই হেরা গুহার ওপর উঠতে হতো। সে গুহাটা এখনও আছে, তার মধ্যে রাসূল (সা.) নির্জনতার সাধনা করতেন। তিনি কী করতেন তা কেউ জানেন না। কিন্তু দীর্ঘ সময় সাধনার পর তিনি নিজেকেই আবিষ্কার করলেন। যখন আল্লাহর তরফ থেকে ফেরেশতা তাঁকে বললেন, “তুমি পাঠ করো। আল্লাহর নামে তুমি পাঠ করো।” সে পাঠের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে, নিজের অস্তিত্বকে আবিষ্কার করলেন। এ অস্তিত্বকে আবিষ্কার করেই তিনি বিভিন্ন মানুষের মাঝে সে অস্তিত্বের তাপ, অস্তিত্বের সঞ্চয়, অস্তিত্বের আনন্দ ও হিল্লোল ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলেন।

ফতেহ মক্কার পর মহিলারা এলো তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর হাত স্পর্শ করতে। তারা সিদ্ধি লাভ করতে চায়। তিনি একপাত্র পানি রাখলেন। পানির মধ্যে হাত ডুবিয়ে তুলে নিলেন। তারপর বললেন, “আমি ঐ পানি স্পর্শ করেছি। তোমরা ঐ পানিতে হাত ডোবালে আমার স্পর্শ পাবে। পানিতে হাত রেখে তোমরা আমার সাথে কথা বলো।” এই যে অসাধারণ কল্পনা, অসাধারণ কবিতা- এর তুলনা হয় না। সে জন্যেই আমাদের জীবনে মেডিটেশন বা নির্জনতা বা একাগ্রতার সাধনা করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু আমরা নাগরিক মানুষ। নাগরিক কোলাহলের মাঝে আমাদের বসবাস। তাই এ সময়কে মেনে নিয়েই, এ অবস্থাকে মেনে নিয়েই আমাদের নিজস্ব অস্তিত্বটাকে আবিষ্কার করতে হবে।

প্রতিটি মানুষ অনন্য। দুজন মানুষ কখনো একরকম নয়। যেমন আকৃতিতে এক নয়, বর্ণ-বিভায় এক নয়, উচ্চারণে এক নয়, তাদের আঙুলের ছাপও এক নয়। নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে শুধু তারা এক। অন্তরের চিন্তার দিক থেকেও তারা স্বতন্ত্র| সুতরাং প্রতিটি মানুষ যে এক একটি একক সেই একক সত্তাকে আবিষ্কার করতে হবে। সমাজ-সংসারের কর্মব্যস্ততায় আমরা আমাদের সেই এককত্বকে হারিয়ে ফেলেছি। আজ আমাদের বড় প্রয়োজন সেই এককত্ব আবিষ্কার করা। আর ধ্যানের মাধ্যমেই তা সম্ভবপর।

ইসলামের সুফিরা এবং হিন্দুদের যোগীরা কতগুলো ধ্যানের প্রকরণ ব্যাখ্যা করেছেন। সেই ধ্যানের প্রকরণগুলো অনেক রকম এবং শরীরের মধ্যে এই প্রকরণগুলো আছে। হিন্দু সাধকরা এগুলোকে বলেন চক্র। এইরূপ বিভিন্ন চক্রে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে চোখ বন্ধ করে থাকতে হয়। তখন একজন মানুষ অনুভব করে ওখানে যে একটি অস্তিত্ব আছে সেটা যেন নড়ছে। তখন সমস্ত পৃথিবীর অস্তিত্ব তার কাছে মিথ্যে হয়ে যায়। সমস্ত মানব সমাজ মিথ্যে হয়ে যায়। সমস্ত অতীত মিথ্যে হয়ে যায়। শুধু ঐ অংশটুকু জেগে থাকে। এই ক্রিয়ায় একজন সাধক ক্রমান্বয়ে নিজেকে আবিষ্কার করেন। মুসলমানদের সুফিরাও কিন্তু একই রকম ভাবেন। তাঁরা বলেন যে, শরীরের মধ্যে ক্বল্‌ব, খফী, আখফা ইত্যাদি নির্দিষ্ট কিছু স্থান আছে যেগুলোকে জাগ্রত করতে হবে। যখন জাগ্রত হয় তখন নিজের যথার্থ অস্তিত্বকে বোঝা যায়। সাধুসন্ত এবং সুফিরা পৃথিবীকে অনেক কিছু দিয়েছেন। আমাদের এ অঞ্চলে ইসলামের যে শিক্ষা, যে অবদান, তা সাধক ও সুফিদের দান। আমাদের দেশে এই সুফিরাই প্রথম ধর্ম প্রচার করেন। তাঁরা সর্বদাই মানবতাবাদী ছিলেন। তাঁদের অন্তরঙ্গ ইচ্ছেটা ছিলো মানুষের আত্মার সঙ্গে পরিচিত হওয়া।

সুফিরা ধ্যানস্থ হয়ে আরেক জনের আত্মার অনুভূতিটা নির্ণয় করতে পারেন। তাঁরা কারো দিকে ধ্যানস্থ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেই বলে দিতে পারেন যে, তুমি এ মুহূর্তে এই চিন্তা করছিলে। আমার নিজের জীবনেই আমি এটা প্রত্যক্ষ করেছি। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এটা কীভাবে সম্ভব? এটা সম্ভবপর। কেননা আমরা ঐ কনসেনট্রেশন-এর মাধ্যমে আরেকজনের হৃদয়কে একাগ্র করে ফেলছি। একাগ্র হওয়ার পর তার হৃদয় আমার হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলছে এবং তখন তার চিন্তা ও অনুভব আমার চেতনায় ধরা পড়ছে। এটা বাস্তবেও প্রমাণ করা সম্ভব। চিকিৎসা শাস্ত্রে ডাক্তার বা সাইকিয়াট্রিস্টরা বলেন, ধরা যাক একজন হেঁটে যাচ্ছে। এখন তার পেছনে দাঁড়িয়ে কেউ তার ঘাড়ের দিকে একাগ্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে কিছুক্ষণ পর সে ঘাড় ফেরায়। এটা ঘটার কারণ হচ্ছে যে, একজনের দৃষ্টির সঙ্গে আরেক জনের শরীরের মাঝে একটি আকর্ষণ শক্তি কাজ করে।

সংস্কৃত উপনিষদে একটা কথা আছে ‘আত্মানাং বিদ্ধি’। অর্থাৎ তুমি আত্মাকে জানো। আরো বলা হয়েছে ‘ভূমৈব সুখং’- অর্থাৎ ভূমাতেই সুখ, অল্পে সুখ নেই। ভূমা অর্থাৎ বৃহৎকে আমি পাবো, অল্প বা ক্ষুদ্রকে নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতেই রবীন্দ্রনাথ রসোচ্ছলে চমৎকার বলেছেন, “তোমার যদি বড় হবার আকাঙ্ক্ষা না থাকে, তুমি যদি শুধু কেরানী হতে চাও, তাহলে কেরানীই হবে। আর কিছু হবে না। কিন্তু তুমি যদি চাঁদকে স্পর্শ করতে চাও তবে চাঁদকে স্পর্শ করতে না পারলেও কাছাকাছি যেতে পারবে।” সুতরাং ভূমা অর্থাৎ বৃহৎকে চাওয়াটাই হলো বড় কথা।

আমরা যারা সাধনার পথে অগ্রসর হচ্ছি, আত্ম-আবিষ্কারের চেষ্টা করছি, তাদের প্রত্যেকের কর্তব্য হচ্ছে একাগ্রতা অর্জন করা এবং নিজের এককত্বকে অনুভব করা।

মানুষ কিন্তু সব সময় মনে করে সে নিজে যা ভাবছে অন্যরা তা ভাবছে না। হয়তো কোথাও কোনো একটা বিপদ ঘটতে যাচ্ছে। একজন মানুষ ভাবে বিপদটা তার নয়। অন্য কারো হতে যাচ্ছে। এটা মানুষের সাধারণ প্রবণতা। একজন মানুষের মধ্যে যে নিজস্বতা আছে সেটা সে উপলব্ধি করে না। আত্মার গভীরে ডুব দিয়ে উপলব্ধি করতে হয় যে, সত্যিই আমি একা, আমি আলাদা, আমি ভিন্ন; তবে আমি সকলের সঙ্গে মিলে আছি, সকলের মধ্যেই থাকবো। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার একটা নিজস্বতা আছে। এটা অনেক বড় বোধের ব্যাপার।

বিজ্ঞানও মানুষের এই অনন্যতা ও এককত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। পৃথিবীর যেকোনো মানুষের আঙুলের ছাপের সঙ্গে আরেকজনের আঙুলের ছাপের কখনো মিল হয় না। তাদের কন্ঠস্বরও ভিন্নতর। বর্ণ ও আকৃতিতে কখনো কখনো একটা আদল আসে। কিন্তু তবুও সেটা ঠিক আদল নয়।

মেডিটেশন বা ধ্যান হচ্ছে আত্ম-আবিষ্কার ও আত্মানুভবের মাধ্যম ও হাতিয়ার। অতএব, ধ্যানকে পবিত্র মনে করতে হবে। প্রত্যেকটি মানুষ- সে কোয়ান্টাম মেথড চর্চা করুক কিংবা নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি অনুসরণ না করে একাকী বসে থাকুক- আমি তাকে ধ্যানরত দেখতে চাই। যখনই সে সময় পাবে তখন কিছুটা সময়ের জন্যে হলেও সে যেন ধ্যানে নিমগ্ন হয়। আর যেকোনো উপাসনা হোক- তার মূল চাবিকাঠি হচ্ছে মনোযোগ ও একাগ্রতা।

এ প্রসঙ্গে গালিবের একটি গল্প রয়েছে। তার মদ্যপানের অভ্যাস ছিলো অসম্ভব বেশি। একদিন তার মদ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু যে লোক মদ আনতে গেছে, সে আর ফিরছে না। ওদিকে মদের তৃষ্ণায় তার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তখন তিনি ভাবলেন আল্লাহর কাছে চাইলেই নাকি সব পাওয়া যায়। তবে যাই, মসজিদে গিয়ে আল্লাহর কাছেই আবদার জানাই। এই ভেবে গালিব সবে এক রাকাত নামাজ আদায় করে দ্বিতীয় রাকাত শুরু করেছেন- তখন দেখলেন যে, তার শিষ্য মদের বোতল নিয়ে আসছে। অমনি তিনিও নামাজ ফেলে দৌড়ে চলে গেলেন। পরে লোকজন তার কাছে নামাজ ফেলে চলে যাবার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি হেসে জবাব দিলেন, “এক রাকাত পড়তেই আল্লাহ খুশি হয়ে গেছেন। তাই আমার শরাব চলে এসেছে।” কৌতুককর হলেও গল্পটির অন্তর্নিহিত অর্থে একাগ্রতার গুরুত্বই প্রকাশ পায়।

এই যে একাগ্রতা, এর মাধ্যমে মানুষ একটা বিষয় শেখে, তা হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা। ইসলামে পরিচ্ছন্নতার ওপর অসম্ভব গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। চৈতন্য পুরীর সমুদ্র দেখেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কারণ অবগাহনের মাধ্যমে শরীরের সকল আবর্জনা ও গ্লানি দূর হয়ে যায়। সুফিরা বলে থাকেন যে, তুমি অবগাহন করবে কিন্তু শরীরকে বিশুদ্ধ রাখবে। বৈষ্ণব পদাবলির একটি গানে আছে যে, পানিতে ডুববে কিন্তু চুল ভেজাবে না। অর্থাৎ আমি ইনভলব হয়ে যাবো, কিন্তু তবু ইনভলব হবো না। আমি পৃথিবীর ব্যতিব্যস্ততার মাঝে নিজেকে নিমজ্জিত করবো। কিন্তু তবুও ব্যস্ততার মাঝে সব সময় আমি থাকবো না। আমার নিজস্বতাকে আমি ঠিকই খুঁজে নেবো।

আজ চতুর্দিকে যে সন্ত্রাস ও মিথ্যাচারের রাজত্ব, চারদিকে মানুষের অবমাননার আপ্রাণ চেষ্টা- এ মিথ্যাচার ও আত্মার অবমাননা থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্যে প্রত্যেকের উচিত তার জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে দেখা। সকলের উচিত ভেবে দেখা- কেন আমি জন্মেছি, আমার অস্তিত্বের দাবি কী। এ আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্ম-অনুসন্ধানের মাধ্যমেই আমরা পরম সত্যকে জানবো, আনন্দকে পাবো, বিশ্বাসকে অনুভব করবো এবং সবশেষে যথার্থ সেই মহার্ঘ বস্তুকে পাবো। ধ্যানের সার্থকতা এখানেই।