দেশের কল্যাণে আবার এক হয়ে কাজ করতে হবে

Bangla
কামাল লোহানী
প্রবীণ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। ভাষা সৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব লোহানী স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রথম পরিচালক। তিনি বাংলাদেশ সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট, প্রেস ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক এবং শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক

এক প্রৌঢ়া বিধবা। পাকিস্তানি আর্মির বিরুদ্ধে অপারেশন চালাতে ব্যস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের এক অস্থায়ী ক্যাম্পে তার ১৭ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে এসে বললেন, ‘আমার এ ছেলেটিকে আপনারা সাথে নিয়ে নিন। যুদ্ধের জন্যে কোনোভাবে কাজে লাগানো যায় কি না দেখবেন।’ ছেলেটি কদিন পরে এক অপারেশনে গিয়ে মারা যায়। শুনে সে মহিলা ৯ বছর বয়সী তার একমাত্র বেঁচে থাকা ছেলেকে নিয়ে এসে বললেন, ‘এবার একে নিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের জন্যে আমি আমার এ সন্তানকেও উৎসর্গ করছি।’

১২ বছর বয়সী এক কিশোর। দাঁড়িয়ে আছে এক পাকিস্তানি সৈন্যের সামনে। কদিন আগে তাদের গ্রামে ঢুকে পড়া পাকিস্তানি বাহিনীর একজন সদস্য এ সৈন্য। ইতোমধ্যেই গ্রামটিতে চালিয়েছে তারা ব্যাপক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। পাকিস্তানি সৈন্যটির তৃষ্ণা মেটানোর খায়েশ চরিতার্থ করতে সে বাধ্য হয়েছে জীবনে প্রথমবারের মতো ডাব গাছে চড়তে। বন্দুকের মুখে ডাব পেড়ে আনলো। হুকুম মোতাবেক দা এনে ডাব কেটেও দিলো। কিন্তু যেই না সৈন্যটি গলা উঁচু করে ডাবের পানি খেতে লাগলো অমনি কিশোরটির মাথায় খেলে গেল বুদ্ধি। গলায় চালিয়ে দিলো ধারালো দা-এর পোঁচ। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হলো তার। বর্বর পাক আর্মির অত্যাচারের বদলা এভাবেই নিতে বাধ্য হলো এক গ্রাম্য কিশোর।

এমনি লাখো সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ, সমর্থন আর সহযোগিতায় মাত্র ৯ মাসে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, পৃথিবীর স্বাধীনতা ইতিহাসে যা এক বিরল ঘটনা।

আসলে আত্মশক্তি-সচেতনতা এবং রুখে দাঁড়ানোর সাহস প্রতিটি মানুষের প্রবৃত্তিজাত। অন্যায়, শোষণ এবং বঞ্চনার মাধ্যমে তাকে যখন সহ্যের শেষসীমায় পৌঁছে দেয়া হয় তখন এই আত্মশক্তিতে সে হুংকার দিয়ে ওঠে, লড়াই করতে প্রবৃত্ত হয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধটা আসলে এরকমই একটা ব্যাপার।

১৯৭১ সালে আমি ছিলাম কলকাতার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। এপ্রিলে মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ করলেন বাংলাদেশের নিজস্ব একটি বেতার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করার জন্যে। দেয়া হলো ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভের একটি ট্রান্সমিটার। কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটা দোতলা বাড়িতে শুরু হলো এর কার্যক্রম। যেটাতে সদ্য গঠিত প্রবাসী সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী প্রথম কিছুদিন অবস্থান করেছেন। বাড়িটির পেছনেই ছিলো বিএসএফ-এর ব্যারাক। দুপুরে যখন তাদের মেসে খাবার দেয়া হতো তখন সেখানে জড়ো হতো শকুন আর কুকুরের দল। বেতারে আমাদের অনু্‌ষ্ঠান প্রচারের সময় মাঝে মাঝে সেসব আওয়াজও ঢুকে পড়তো বৈকি। কিন্তু প্রবাসে বসে একটা যুদ্ধরত জাতির একমাত্র নিজস্ব প্রচার মাধ্যম পরিচালনায় এ ত্রুটিটুকু বোধ হয় অনায়াসেই মেনে নেয়া যায়।

পাকিস্তানি বোমা আঘাত হানার পর চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জনা দশেক বেতার কর্মী ১০ কিলোওয়াটের একটা ছোট্ট টান্সমিটার নিয়ে পালালেন। পাহাড়, পর্বত, জঙ্গল পাড়ি দিয়ে তাদের একটা দল গিয়ে পৌঁছলো আগরতলায়। এদের মধ্যে সাংস্কৃতিক কর্মীরা ছিলেন, ছিলেন বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মী আর দেশের জন্যে প্রাণ উৎসর্গে ব্রতী শব্দ-সৈনিকেরা।

বন্য শুকর হেঁটে যাচ্ছে আর তার সামনে বসে ভাত খাচ্ছে বেতারকর্মী। সিগারেটের প্যাকেটের একটুখানি কাগজে কোনোরকমে লেখা খবর থেকে পড়ে শোনানো হচ্ছে সংবাদ বুলেটিন। ইংরেজি অনুবাদ করে তা-ও পড়ে শোনাতে হচ্ছে। আবার বাংলা ইংরেজির পাশাপাশি উর্দুতেও খবর এবং অনুষ্ঠান করতে হবে এই সীমিত লোকবল নিয়েই।

যারা খবর পড়তেন কন্ঠস্বর এবং উচ্চারণের বেতার মানদণ্ডে তারা হয়তো উৎরাবেন না। কিন্তু সে খবর শোনার জন্যে মানুষ কী উদগ্রীব হয়ে বসে থাকতো। লেপের তলায় দরজা-জানালা বন্ধ করে বা ১০/১২ জন একসাথে বসে হন্যে হয়ে চেষ্টা করতো স্বাধীন বাংলা বেতারের একটু খবর শোনার জন্যে।

একবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে লাগাতার ৩ দিনের হরতালে আমরা ভীষণ অসুবিধায় পড়লাম। কারণ বালিগঞ্জ থেকে ৪৫ মিনিটের গাড়িপথের একটা দূরত্বে স্থাপিত হয়েছিলো আমাদের ট্রান্সমিটার। সেখানে অবশ্য আমাদের যাওয়ার সুযোগ ছিলো না। নির্দিষ্ট সময়ে বিএসএফ-এর একজন লোক এসে তার পোর্টফলিওতে আমাদের টেপগুলো ভরে নিয়ে যেতেন। এখন হরতালের মধ্যে কীভাবে সেখানে যাওয়া যাবে- এ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলো।

আমরা বাংলা, ইংরেজি এবং উর্দু- এই তিন সার্ভিসের জন্যে তিনজন সংবাদ পাঠক এবং একজন টেকনিশিয়ান পাঠানোর অনুমতি চাইলাম। কিন্তু তারা শুধু আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিলো। আমরা তখন একটু বিকল্প পথে কাজ করলাম। রণাঙ্গন থেকে মাঝে মাঝে আমাদের কাছে সহযোগীরা আসতেন। তারা বলে যেতেন আগামী কয়েকদিনে তাদের সম্ভাব্য অপারেশনগুলোর কিছু পরিকল্পনার কথা। যেমন, এ অপারেশনে এই এই অস্ত্র ব্যবহার করা হবে, এতে এরকম ক্ষতি হতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব পরামর্শের ভিত্তিতে আমরা তখন বসে তৈরি করে ফেললাম আগামী ৩ দিনের জন্যে ৯টা বুলেটিন। অর্থাৎ যা ঘটতে পারে তাকে ‘ঘটেছে’ হিসেবে বর্ণনা করে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশল। আর তার ফলাফলও এসেছিলো আমাদের অনুকূলেই।

সেই দিনগুলো যতবার স্মরণ করি ততবারই রোমাঞ্চিত হই, শিহরিত হই। ভাবি, কী অসাধারণ বীরত্ব, সাহস আর সমবেত সঙ্ঘবদ্ধ চেষ্টার নজির বাঙালি প্রতিষ্ঠা করেছিলো। কিন্তু তারপর যখন বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকাই হতাশ হয়ে পড়ি। অবাক লাগে যে, এই কি সেই বাঙালি জাতি যারা একসাথে লড়ে মাত্র ৯ মাসে পরাজিত করেছে পৃথিবীর অন্যতম সুসংগঠিত সুসজ্জিত একটি সেনাবাহিনীকে।

কিন্তু কেন এ অবস্থা? আমার মনে হয় দেশের স্বাধীনতা আমরা চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের চাওয়ার উদ্দেশ্যে সততার অভাব ছিলো। আমরা কেউ অর্থলিপ্সু, কেউ ক্ষমতালিপ্সু, কেউ পদলিপ্সু হয়ে পড়লাম। ফলে স্বাধীনতা অর্জনের পর সেটাকে অর্থবহ করার জন্যে যে সম্মিলিত এবং স্বমন্বিত প্রয়াস দরকার, তা আমরা করতে পারি নি।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যে দরকার লক্ষ্য এবং মানসিকতার সার্বজনীনতা। সবাইকে এক হয়ে একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করতে হবে আর তা হলো দেশের কল্যাণ, জাতির শেকড় সন্ধান।