দুঃখক্লিষ্ট মানুষের মনে শান্তির বাণী পৌঁছে দিয়েছে কোয়ান্টাম

Bangla
আল্লামা ড. এম শমশের আলী
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য আল্লামা ড. এম শমশের আলী দেশের নেতৃস্থানীয় পদার্থবিজ্ঞানী। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক ও টিভি ব্যক্তিত্ব। জাতীয় জীবনে বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাভাবনা প্রসারে তিনি গ্রহণ করেছেন অগ্রণী ভূমিকা। বর্তমান

‘কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন’ নামটাকে আমার খুব তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। কোয়ান্টাম শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো পরিমাণ। কিন্তু একজন পদার্থবিদ হিসেবে ‘কোয়ান্টাম’ শব্দের গুরুত্ব আমার কাছে আরো বেশি। কারণ দৃশ্যজগতে সবকিছু একইরকম হলেও বিজ্ঞানের চোখে ল’জ অব দ্য স্মল আর ডিফারেন্ট ফ্রম দা ল’জ অব দ্য লার্জ। অর্থাৎ বিজ্ঞানে বড় জিনিসের জগৎ আর ছোট জিনিসের জগৎ এক নয়। দৃশ্যজগতে শক্তিকে আমরা দেখি নিরবচ্ছিন্ন হিসেবে। কৌণিক ভরবেগ, এঙ্গুলার মোমেন্টাম- সবকিছুই নিরবচ্ছিন্ন। কিন্তু আমরা যদি ছোট জিনিসের জগতে যাই, তাহলে দেখবো সেখানে পদার্থের অণুরা যে গতি বিনিময় করছে তা নিরবচ্ছিন্ন নয়। থোকায় থোকায়, গুচ্ছে গুচ্ছে হয় এ শক্তি দেয়া-নেয়া। আর এটাই কোয়ান্টাম মেকানিক্স।

এখন আমরা যদি আমাদের দেহের দিকে তাকাই, আমাদের সমস্ত চেতনার মূল হলো নিউরোন যা অতি সূক্ষ্ম। আর এ নিউরোনগুলো যে প্রক্রিয়ায় কাজ করে তা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আওতায়ই পড়ে। সুতরাং ‘কোয়ান্টাম’ নাম দেয়াটা খুব যথার্থ হয়েছে। কারণ কোয়ান্টাম শেখায় আত্মমগ্নতার মধ্য দিয়ে চেতনার গভীর থেকে একজন মানুষ কীভাবে পাবে তার অশান্তি, অসুস্থতা আর ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙার পথ। কোয়ান্টাম শেখায় দেহ-মনের অফুরন্ত শক্তিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে কীভাবে একজন মানুষ তার কাজে লাগাতে পারে।

দুঃখক্লিষ্ট মানুষের মনে শান্তির বাণী পৌঁছানো, তাকে আত্মবিশ্বাস যোগানো- এটাই হলো তার সবচেয়ে বড় সেবা। অর্থ দিয়ে এর কোনো পরিমাপ হয় না। গত ১৭ বছর ধরে নিরলস সেবার মধ্য দিয়ে কোয়ান্টাম এখন ৩০০ তম কোর্স সম্পন্ন করেছে। নিঃসন্দেহে এ এক মাইলফলক। কারণ মেডিটেশন কোর্সের মতো একটি বিষয়, যে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের তেমন কোনো ধারণা ছিলো না, তার ৩০০ তম কোর্স হওয়াটাই প্রমাণ করে- এ কোর্স মানুষের জীবনে কোথায় স্থান করে নিয়েছে। একজন এসেছে, উপকার পেয়েছে, তার বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়কে বলেছে, নিয়ে এসেছে তাকেও। এভাবেই তো এগিয়েছে কোয়ান্টাম চেতনা।

মোরাকাবা, তাফাক্কুর, ধ্যান, মেডিটেশন- এটা ইসলামের একটা উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি। যেমন নামাজ। মুসলমানদের দৈনন্দিন এ ফরজ ইবাদতটি আসলে ধ্যান এবং যোগাসনের একটি যুগপৎ উপযোগিতা। আমরা যখন নামাজ পড়ি, দুনিয়ার সমস্ত কোলাহল থেকে দূরে সরে গিয়ে নিবিষ্টচিত্তে স্রষ্টার কাছে আত্মনিবেদন করি। হয়তো স্রষ্টাকে দেখছি না, শুনছি না কিন্তু তিনি আমাকে দেখছেন, আমাকে শুনছেন- এই যে নিবিষ্টচিত্তে কল্পনা, একাগ্রচিত্ততা- এটাই তো ধ্যান।

একবার হজরত আলী (রা)-র পায়ে তীর বিঁধলো। প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। কয়েকজন সাহাবী তীর খুলতে উদ্যত হলেন। কিন্তু তীরে হাত দিলেই আলী (রা) চিৎকার করে ওঠেন ব্যথায়। রসুল (স) বললেন, আলী যখন নামাজে সেজদায় থাকবে তখন তীরটা খুলে নিও। কারণ নামাজে সে এত নিমগ্ন থাকবে যে, ব্যথা কিছুই টের পাবে না। তা-ই হলো। আলী (রা) নামাজে দাঁড়ালেন। তীর খুলে নিলেন সাহাবীরা। তিনি টেরই পেলেন না।

মোবাইল ফোনের এ যুগে এক দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের আরেক দেশে সরাসরি কথা বলা, কথা শোনা এখন খুব দৈনন্দিন একটি ব্যাপার। একসময় এটা যতই অকল্পনীয় ব্যাপার হোক না কেন, এখনকার বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফলে আমরা জানছি যে, কলারের মোবাইল থেকে একটা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সিগনাল ট্রান্সমিট হচ্ছে। সেই সিগনালটা রিসিভড্‌ হচ্ছে রিসিভারের মোবাইলে। আর সেটা সম্ভব হচ্ছে কলার এবং রিসিভারের মধ্যে একটা বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সিতে টিউনিং হচ্ছে বলে।

একইভাবে বান্দা যদি আল্লাহকে ডাকতে পারে, টিউনিংটা যদি ঠিকভাবে হয়, তখন স্রষ্টার সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপিত হয়ে যায়। এজন্যে ওলি আউলিয়ারা ধ্যানের পরামর্শ দিয়ে গেছেন। নিবিষ্ট চিত্তে যিনি ধ্যান করেন তিনিই বুঝতে পারেন যে, কীভাবে ধ্যান করলে আল্লাহর সঙ্গে তার একটা সংযোগ হবে। এ যোগাযোগ বাইরের মানুষ টের পায় না। সেরকম এই বিশ্বস্রষ্টার সঙ্গে, যিনি আমাদের প্রভু, যিনি আমাদের প্রতিপালক, যিনি আমাদের জীবনের সবকিছুর বিধায়ক- তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার পদ্ধতি হচ্ছে ধ্যানের পদ্ধতি।

নামাজে যোগাসন বা ব্যায়ামের উপযোগিতাও আমরা লাভ করি। আমরা রুকুতে যাই, সেজদায় যাই, মাথা থেকে রক্ত চলাচল হয়। আমরা যখন আঙুলে গুণতে থাকি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ’- তখন আমাদের হাতের আঙুলের যে কতগুলো পয়েন্টের কমেপ্রশন তা রক্ত চলাচলকে স্বাচ্ছন্দ করে। সুতরাং দৈহিক, আত্মিক, মানসিক- সবদিক দিয়ে নামাজ আমাদের উপকার করে। ধ্যান থেকেও আমরা দৈহিক-মানসিক ও আত্মিকভাবে উপকৃত হই।

বিক্ষিপ্ততা কাজের কার্যকারিতাকে ব্যাহত করে। অন্যদিকে কনসেনট্রেশন বা সংবদ্ধতা এনার্জি বা শক্তিকে ফোকাসিং করে কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে অনেক বড় কাজও হয়ে যায় সহজে। ধ্যান বা মেডিটেশনে এ কাজটিই হয়। বিশেষ একটি দিকে আমি চিন্তা ধাবিত করছি। শক্তি সঞ্চারিত হচ্ছে এবং সে শক্তি দিয়ে সম্ভব হচ্ছে অনেক অভাবনীয় কাজ।

অর্থাৎ আল্লাহ একটা সিস্টেম দিয়েছেন, যদি বিশ্বাস জন্মে যে, এ সিস্টেমের কোনো ত্রুটি জয় করার ক্ষমতাও আল্লাহ দিয়েছেন, তাহলে কিন্তু আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ধ্যান এই আত্মবিশ্বাসকে অসাধারণভাবে জাগিয়ে তোলে। মেডিটেশনের গুরুত্ব তাই অপরিসীম। মেডিটেশন মানুষকে শারীরিক এবং আত্মিকভাবে জাগ্রত করে, শক্তিশালী করে এবং তার আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।