কোয়ান্টাম শিশুসদন

ওরা কোয়ান্টাম পরিবারের সন্তান। কোয়ান্টাম শিশুসদনের ছোট্ট সোনামনি। ওদের বয়স ছয় মাস থেকে পাঁচ-ছয় বছর। আর দশটি শিশুর মতোই মা-বাবার আদরে আর আত্মীয়-পরিজনের মমতায় থাকার কথা ছিলো তাদের। কিন্তু ওদের ভাগ্যে তা জোটে নি। জন্মের পর কোনো অজানা অপরাধে ওরা হয়ে গেলো মা-বাবাহীন, আশ্রয়-অভিভাবকহীন। কিন্তু ওরা পেয়েছে আলোর ঠিকানা। ওরা আর এখন সমাজের বোঝা নয়। আজ ওরা কোয়ান্টাম পরিবারের সন্তান। কোয়ান্টাম শিশুসদনের ছোট্ট সোনামনি। কোয়ান্টাম বিশ্বাস করে অসীম সম্ভাবনাময় এদেশের প্রতিটি শিশু সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে গড়ে তুলবে এক মানবিক মহাসমাজ। সে লক্ষ্যেই দুঃস্থ-ছিন্নমূল এসব নবজাতকদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠিত হয় কোয়ান্টাম শিশুসদন।
যেন ১২টি বোন
শিশুসদনের প্রথম ভাগ্যবান শিশু নাদিরা তাহসীন। ২০০৪ সালের মার্চ মাসে নাদিরার আগমনের মধ্য দিয়ে কোয়ান্টাম শিশুসদনের যাত্রা শুরু হয়। এরপর একে একে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছে নাফিসা, নাবিলা, লাবিবা, নাজিয়াসহ মোট ১২টি শিশু।
এরা সবাই শিশুসদনে এসেছে ৩০ দিনেরও কম বয়সে। কাউকে তাদের অভিভাবক স্বেচ্ছায় দিয়ে গেছেন। আবার কাউকে পাওয়া গেছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।
শিশুসদনের ১২টি শিশু যেন ১২টি বোন। ৫ বোন প্রায় পিঠাপিঠি; বয়স ৫ থেকে সাড়ে ৫ বছরের মধ্যে। আর সর্বকনিষ্ঠজনের বয়স আড়াই বছর।
যাদের দায়িত্ব এই সমাজ নেয়নি, বাবা-মাও পারেনি তাদের কর্তব্য পালন করতে, কোয়ান্টাম শিশুসদনের সেই ছোট্টমণিরাই এখন অনেক দায়িত্ববান। তারাই দায়িত্ব নিচ্ছে শিশুসদনে আসা তাদের ছোট বোনদের। শিশুসদনের নাদিরা, লাবিবা, নাফিসারা এখন বাকী সবার বড় আপু। তারাও বড় বোনের মত আদর করে, প্রয়োজনে শাসনও। আবার কখনো জামাটাও পরিয়ে দেয় পরম মমতায়।
শিশুসদনের মায়েরা
মায়ের আঁচলের ছোঁয়া না পেলেও ওরা বঞ্চিত হয়নি মাতৃস্নেহ থেকে। ওদের যত্নে সদা নিয়োজিত শিশুসদনের মায়েরা। শিশুদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্যে রয়েছেন ১০ জন আয়া। বাচ্চারা তাদেরকেই মা বলে ডাকে। খেলাধুলো, দৌড়-ঝাঁপের মধ্য দিয়েই একজন হাউজ টিউটরের কাছে চলে ছড়া-কবিতা, বর্ণমালা আর অংক শেখার ক্লাস।
তাদের প্রতিদিনের খাবারের মেনু তৈরি করা হয়েছে পুষ্টিবিজ্ঞানের আলোকে। এছাড়া সপ্তাহে ২ দিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়।
কোয়ান্টাম পরিবারেরর প্রাণ যেন ওরা
আপন মা-বাবার কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত এ শিশুরা কোয়ান্টাম পরিবারে যে কতখানি কাঙ্ক্ষিত তার উদাহরণ হলো তাদের আকিকা ও দোয়া অনুষ্ঠানটি। ২০০৪ সালের নভেম্বরের ২৬ তারিখে প্রথম ৫টি শিশুর আকিকা দেয়া হয়। রাজশাহী সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ আকিকা অনুষ্ঠানে সারাদেশ থেকে অংশ নেন ২,৭০০ অতিথি। সেদিন কোয়ান্টাম গ্রাজুয়েট-এসোসিয়েটসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহণে মুখরিত ছিলো রাজশাহী সেন্টার।
ব্যাপক এ আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্যে সেন্টারের প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা করেছেন সবরকম সহযোগিতা। তাদের বাড়ির ছাদ ও জমিতে ৫টি স্টেশন নির্মাণ করে অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ করেন প্রতিবেশীরা। সুস্বাদু খাবার সবাইকে তৃপ্তির সাথে খাওয়ানোর পরও যেন ফুরাচ্ছিলো না। বিদায় নেয়ার সময় অতিথিরা আবারও শিশুদের একনজর দেখে তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে প্রাণভরে দোয়া করেছেন। এতিমের মাথায় যার হাত থাকে, স্রষ্টার রহমত সরাসরি তার ওপর বর্ষিত হয়- এ বাণীর প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিললো সেদিন। এতিম, পরিত্যক্ত যে মাসুম শিশুরা একসময় পরিস্থিতির বলি হতে যাচ্ছিলো, তারাই এখন একটু একটু করে বেড়ে উঠছে আলোকিত মানুষ হিসেবে। পরিবার তাদের স্থান দিতে পারে নি, কিন্তু তারাই একসময় সবখানে গড়ে নেবে নিজেদের সম্মানজনক অবস্থান। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সকল সদস্যের আন্তরিক দোয়া নিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছে আত্মপরিচয় সৃষ্টির এই সাহসী অভিযাত্রীরা।
কোয়ান্টাম পরিবারের প্রাণ যেন ওরা। আর এ পরিবারই এখন তাদের ঠিকানা, শেকড়, আত্মিক নির্ভরতার আশ্রয়স্থল।
আপনার দোয়া ও সহযোগিতায় এ শিশুটিও হতে পারে আলোকিত মানুষ
এ শিশুদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়তে আপনার যেকোনো সহযোগিতা সাদরে গ্রহণীয়। একটি শিশুর আত্মিক অভিভাবক হোন। আপনার দোয়া ও সহযোগিতায় এ শিশুটিও হতে পারে আলোকিত মানুষ।