কোয়ান্টাম মেথড নির্যাতিতাকে মানসিকভাবে পুনর্বাসিত করতে পারে

এডভোকেট সালমা আলী বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক। নিরাপত্তা হেফাজতের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকারে প্রথম সফল আইনজীবী। তার সাহসী ভূমিকার জন্যে দক্ষিণ এশিয়ায় নারী ও শিশুপাচার বন্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে তার অবদানের জন্যে লাভ করেছেন অশোক ফেলোশিপ। তিনি কোয়ান্টাম মেথড কোর্সের ২৭৩ তম ব্যাচে অংশগ্রহণ করেন।
আজ থেকে ২৯ বছর আগে একটি পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে মহিলা আইনজীবী সমিতি যাত্রা শুরু করে। সে সময় আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো আইন পেশার সঙ্গে জড়িত মহিলাদের সংগঠিত করা, তাদের দক্ষতা বাড়ানো এবং পুরুষ সহকর্মীদের সাথে প্রতিযোগিতায় তারা যাতে পিছিয়ে না পড়ে সেজন্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ। সংগঠন করার পর আমরা দেখলাম সাধারণ মানুষদের অনেকেই- বিশেষত মহিলারা- নির্যাতনের শিকার হয়ে আমাদের কাছে আসছে সাহায্য বা পরামর্শ নিতে। চরম দারিদ্রপীড়িত বা অসহায় অবস্থায় নিপতিত এই নির্যাতিতাদের সাহায্য করার জন্যেই তখন আমরা শুরু করলাম আইনী সহায়তা দেয়ার কাজ।
এর মধ্যেই একটা জরিপের কাজে এক জেল পরিদর্শনে গিয়ে দেখলাম ভয়ংকর অবস্থা। নিরাপত্তা হেফাজতের নামে অপরাধী বন্দিদের সঙ্গে বছরের পর বছর বন্দি হয়ে আছে অপরাধের শিকার মানুষগুলো যাদের অধিকাংশই মহিলা। এমনকি একজন আসামী যে সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, এদের তা-ও নেই। তার ওপর আছে রক্ষক নামধারী ভক্ষকদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতি মুহূর্তের আতঙ্ক। বিষয়টা এত দাগ কাটলো যে, তারপরই আমরা এদের জন্যে কাজ শুরু করলাম। দেখলাম শুধু দেশে নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন জেলখানায়ও প্রচুর বাংলাদেশি মেয়ে আটকে আছে। এদেরকে উদ্ধার করার পর যে সমস্যাটি সামনে এলো তা হলো এদেরকে কোথায় রাখা হবে। কারণ তাদের বেশিরভাগেরই পরিবারে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না। সরকার বা কোনো এনজিওরও এরকম কোনো ব্যবস্থা নেই। অতএব অফিসের ভেতরেই ৫ জন মেয়ে নিয়ে আমরা শুরু করলাম মহিলা আইনজীবী সমিতির শেল্টার হোম ‘প্রশান্তি’-র কার্যক্রম। এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও রয়েছে এর ব্যাপক পরিচিতি। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আমরা ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে পারি স্থানীয় এনজিওদের সহায়তায়। জেলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমরা ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার স্থাপন করেছি। এতে নির্যাতনের শিকার মেয়েকে চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি আইনী সহায়তা ও কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে মানসিক সমর্থন দেয়া হয়।
একটি মেয়েকে সাহায্য করা মানে তার পুরো দায়িত্ব নেয়া। এমনকি ভিকটিম নিজেই যখন মামলা করতে ভয় পায় বা দীর্ঘসূত্রিতায় হাঁপিয়ে ওঠে তখন আইনী সহায়তা দেয়াটাও কঠিন হয়ে যায়। তাকে দিনের পর দিন বোঝাতে হয়, ভরসা দিতে হয়, নিরাপত্তা দিতে হয়। এমনকি সাক্ষীকেও রাজি করাতে হয়, তার নিরাপত্তা বিধান করতে হয়। আবার কিছু বিশেষ পরিস্থিতি আসতে পারে। যেমন, পাচার থেকে উদ্ধার পাওয়া কাউকে দেশে ফিরিয়ে আনলেও আবার বিদেশে পাঠাতে হতে পারে মামলার প্রয়োজনে বা কেউ হয়তো মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তখন এ খরচও আমাদেরই বহন করতে হয়।
নির্যাতনের ব্যাপারে আমরা মনে করি প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ কার্যকরী। জন্ম নিবন্ধন আইন, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন এমনি কয়েকটি আইন যা আমাদের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার প্রণয়ন করেছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আইন থাকলেও আইনের বাস্তবায়ন নেই। এজন্যে শুধু সরকার বা রাজনীতিকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। দায়িত্ব আমাদেরও।
যে অবস্থা থেকে একজন নির্যাতিতাকে আমরা উদ্ধার করি এটা কিন্তু তার নির্যাতনের ইতিহাসের দ্বিতীয় উপাখ্যান। প্রথম উপাখ্যানের সূচনা তার নিজের পরিবার, গোত্র বা সমাজ থেকেই। যেখানে সে হয়তো সৎ মা বা সৎ বাবার দ্বারা নির্যাতিত, আত্মীয়ের যৌন নিপীড়নের শিকার, বাল্যবিয়ে বা স্বামী অত্যাচার ও বহুবিয়ের শিকার। এ অত্যাচার, বঞ্চনা থেকে বাঁচার জন্যে পরিবার থেকে বেরিয়ে এসে সে সম্মুখীন হয় আরো বড় নির্যাতনের বা প্রতারণার। শহরে এসে বাসাবাড়িতে বা গার্মেন্টসে কাজ করতে গিয়ে অথবা বস্তিতে, রাস্তাঘাটে প্রতি পদে পদে শিকার হয় বঞ্চনা, নির্যাতন আর যৌন হয়রানির। হয়তো পতিতালয়ে বিক্রি হয়ে যায় বা পাচার হয়ে যায়।
আমাদের কাছ পর্যন্ত আসে যখন ভিকটিমের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, আর ধামাচাপা দেয়ার উপায় নেই। কিন্তু নির্যাতনের একটা বড় অংশই থেকে যাচ্ছে পর্দার অন্তরালে। সম্মানের কথা ভেবে দিনের পর দিন নীরবে সয়ে যায় এ অত্যাচার। পারিবারিক সহিংসতার ক্রমবর্ধমান হারের কথা বিবেচনা করে এখন অবশ্য আমরা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যে একটি ডমেস্টিক ভায়োলেন্স ল’র কথা ভাবছি। কিন্তু অনেক শক্ত আইন দিয়েও কোনো লাভ নেই যদি ভিকটিম বিচার প্রার্থনায় আগ্রহী না হন, সেই আনুকূল্য না পান। ইভ টিজিং-এর বহু ঘটনা, থার্টি ফার্স্ট নাইটে বাঁধনের হয়রানি বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলোর বিচার এ কারণেই এগোয় নি যে, সামাজিক হয়রানির কথা ভেবে মেয়েরা সাহস পায় নি। নিউজিল্যান্ডের একজন মানবাধিকার কর্মী সেদিন মন্তব্য করছিলেন, ‘ডিমের ফাঁপা খোসার মতোই অবস্থা তোমাদের মেয়েদের। বাইরে সাজ-গোজ, হাসিখুশি চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও ভেতরে গুমরে মরছে শুধু কান্না আর অসহায়ত্বের দীর্ঘশ্বাস।’
জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে আমরা মানবাধিকার রক্ষায় ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছি। আমাদের এ তৎপরতা আরো সফল হবে যদি মানবাধিকারের ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা এবং ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে। আমার মনে হয় আমাদের কাজে একটি পরিপূরক ভূমিকা রাখতে পারে মেডিটেশন। কারণ নির্যাতিত হওয়ার পর একজন মানুষ যে মানসিক বিপর্যয়, হতাশা এবং হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত হয় তখন মেডিটেশনই পারে তাকে সত্যিকারভাবে উজ্জীবিত করতে, আত্মবিশ্বাসী করতে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে।
এ কৌতূহল নিয়েই অংশ নিয়েছিলাম ২৭৩ তম কোয়ান্টাম মেথড কোর্সে। কোর্সে এসে মনে হয়েছে আমার ধারণা সঠিক। একজন নির্যাতিতা মেয়েকে তুলনা করা হয় একটা দোমড়ানো সাদা কাগজের সাথে যা আর কখনো আগের মতো মসৃণ হয় না। কিন্তু এখন আমি বিশ্বাস করি >মেডিটেশন আলোচনা কাউন্সেলিং- সবকিছু মিলিয়ে যথার্থই এ কোর্স একজন মানুষকে মানসিকভাবে পুনর্বাসিত করতে পারে। পরিণত করতে পারে আগের চেয়েও ধবধবে নিভাঁজ এক সাদা কাগজে।
কোর্স করে ব্যক্তিগতভাবেও আমি উপকৃত হয়েছি। হাঁটু, কোমরের ব্যথা থেকে মুক্ত হয়ে এখন ঠিকভাবে রুকু-সেজদা দিয়ে নামাজ পড়তে পারি।