কোয়ান্টাম : প্রশান্তি ও সুস্থতার সুবাতাস

Bangla
জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম
জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম এদেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা বিদ্যাপীঠ আইপিজিএমআর (বিএসএমএমইউ)- এর রূপকার- ফাউন্ডিং ফাদার হিসেবেই কেবল নন, অসামান্য চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও তৃতীয় বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী জাতীয় ওষুধনীতির অন্যতম প্রণেতা হিসেবেও বিশ্বজোড়া খ্যাতির অধিকারী।

কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে সদ্য এমবিবিএস করে ঢাকায় চাকরি খুঁজছি। হঠাৎ মেজভাইয়ের টেলিগ্রাম- মাদার হোপলেস, কাম। ‘মায়ের বাঁচার আশা নেই। চলে এসো।’ সঙ্গে সঙ্গে বিমান অফিসে গিয়ে শুনি মাত্র ২/৩ মিনিটের মধ্যেই ছেড়ে যাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম ফ্লাইট। রাতে ট্রেনে যাওয়া ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।

পরদিন ভোরবেলা বাড়ি পৌঁছে দেখি মা অজ্ঞান। ৮/১০ দিন ধরে অবিরাম জ্বর। মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। বুঝলাম এটা সন্নিপাত জ্বর। ইতোমধ্যে পরিবারের আরেকজন ডাক্তারের পরামর্শমতে একজন শহরে গেছেন ক্লোরোমাইসেটিন আনতে। কিন্তু ওষুধ আনার পর দেখা দিলো আরেক বিপত্তি। ক্যাপসুল মুখে খাওয়ানো সম্ভব নয়। আর তখনও এর ইনজেকশন আবিষ্কার হয় নি। হঠাৎ মাথায় এলো নাকের ভেতর দিয়ে পেটে টিউব ঢুকিয়ে ওষুধ দেয়া যেতে পারে। ক্যাপসুল ভেঙে দুধের সাথে মিশিয়ে সিরিঞ্জ দিয়ে টিউবের মাধ্যমে ওষুধ খাওয়াবো ঠিক করলাম। আত্মীয়স্বজনরা আপত্তি করলো। এমন একটা লম্বা টিউব নাকের ভেতর দিয়ে পেটে ঢোকানো স্বভাবতই তাদের কল্পনার বাইরে।

সবাইকে ঘর থেকে বের করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিলাম। টিউব দিতে কোনো অসুবিধা হলো না। ছ-ঘণ্টা পরপর ক্লোরোমাইসেটিন দিতে লাগলাম। সারাক্ষণই আমি বা আরেকজন পর্যবেক্ষণে থাকতাম। দিন-তিনেক পর একদিন ভোরবেলা দেখি মা চোখ মেলে তাকালেন। আর কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থও হয়ে উঠলেন। আমার মা গুলমেহের বেগম এরপরও বেঁচে ছিলেন ৩৮ বছর। ১৯৯০ সালে ৯৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান। আমার পেশাজীবনের প্রথম রোগী মা-কে সুস্থ করে তোলা আমার এক পরম সৌভাগ্য।

৪ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর মা-ই ছিলেন আমার সব। মায়ের দোয়ায় অটল বিশ্বাস এবং তার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত আমাকে সমস্ত অন্যায়-অবিচার, বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করবে এ দৃঢ় বিশ্বাস আমার মনে চিরদিন অক্ষুণ্ন ছিলো। হয়েছেও তা-ই।

মেট্রিক পাশের পর যখন কলেজে পড়ার কথা উঠলো শুরু হলো অনিশ্চয়তা। গ্রামে পড়াশুনা করতে পয়সাকড়ি লাগে নি। কিন্তু শহরে জীবনযাপন আলাদা। বই-পত্র, থাকা-খাওয়া, আসা-যাওয়া সবকিছুতেই টাকা লাগে। কী করবো ভেবে মন খারাপ করছি। এমন সময় বড় ভাই কলকাতা থেকে চিঠি লিখলেন, আমার পড়াশোনার ব্যবস্থা কলকাতায় হবে। ভর্তি হলাম কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে।

ইসলামিয়া কলেজে প্রতিটি ছাত্রকে শেরওয়ানি পরতে হতো। এটা ছিলো বাধ্যতামূলক। নইলে উপস্থিতি গণ্য করা হতো না। আমার ছোটমামার একটা পুরনো শেরওয়ানি যোগাড় করলাম। কিন্তু গায়ে দিয়ে দেখি অনেক জায়গায় ছেঁড়া! শেষমেশ বুদ্ধি করলাম শুধু রোলকল পর্যন্ত এটা গায়ে রাখবো। রোলকলের পর খুলে পাশে রেখে দিতাম। একবার এর জন্যে ক্লাসে উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত হতে হলো। তারপরও কলেজের দুটি বছর ছেঁড়া পুরনো শেরওয়ানি দিয়েই কাটিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ পোশাকের পেছনে অত খরচ করার সঙ্গতি আমার ছিলো না।

ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ছিলো ডাক্তারি পড়বো। আইএসসি রেজাল্টের পর কলকাতায় এসে শুনি মেডিকেল কলেজে ভর্তির ফরম নেয়ার তারিখ শেষ। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। গুরুজনরা পরামর্শ দিলেন বি এ পড়তে। আমি মেনে নিতে পারলাম না। সেক্রেটারিয়েটে গিয়ে সচিবের সঙ্গে দেখা করে সমস্যার কথা বললাম। কিন্তু বার বার গিয়েও তার সহানুভূতি পেলাম না। শেষমেষ মরিয়া হয়ে দেখা করলাম কলেজের ইংরেজ অধ্যক্ষের সঙ্গে। তাকে সবকিছু খুলে বলতেই তিনি সেই সচিবকে ডেকে আমাকে ফরম দিতে বললেন। এ ঘটনা থেকে আমি শিক্ষা নিলাম যে, সৎ প্রচেষ্টা সফলতা আনে। সেদিন নির্ভয়ে এগিয়ে না গেলে জীবন হয়তো অন্যরকম হতো।

পেশাগত জীবনে অনেক অপ্রত্যাশিত সুযোগ যেমন এসেছে তেমনি এসেছে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত অন্যায় অবিচার বিরোধিতা। কিন্তু আমি কখনো ধৈর্যহারা হই নি। নীরবে কাজ করে গেছি আর প্রতিকারের অপেক্ষা করেছি। কারণ আমি বিশ্বাস করেছি, প্রতিভা আপন গতিতে প্রবাহিত হতে পারে এবং একদিন না একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই। আর এক সুযোগ হাতছাড়া হলে তার প্রতিদানে আরো একাধিক সুযোগ এবং সম্ভাবনা আসে- এটি আমি আমার জীবন-অভিজ্ঞতায়ই দেখেছি।

সৎপথে থেকে সাহসের সাথে এগিয়ে চলা আমার স্বভাব| আমার মতে- আন্তরিকতা এবং জীবনস্রোতে সততা শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সে কারণেই পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি যখন যেভাবে সুযোগ পেয়েছি সমাজের জন্যে কাজ করেছি। সমাজের যেকোনো ভালো উদ্যোগের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করি নি। কোয়ান্টাম হলো এমনি একটি উদ্যোগ।

১৭ বছর আগে শিথিলায়ন ক্যাসেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম। কারণ অসুস্থ, অস্থির-অশান্ত আধুনিক মানুষের জীবনে প্রশান্তির সুবাতাস আসতে পারে মেডিটেশনের মাধ্যমে। আমি তখনই উপলব্ধি করি, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিপূরক হিসেবে কোয়ান্টাম মেথড চমৎকার কাজ করতে পারে। যেসব রোগের ওষুধের প্রয়োজন নেই কোয়ান্টামই হতে পারে তার নিরাময়ে সার্থক বিকল্প। আর এখন ৩০০ কোর্সপূর্তির মধ্য দিয়ে কোয়ান্টাম এ সত্যকেই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।