কোয়ান্টামই হবে দিনবদলের অনুঘটক

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপরে তার কোনো আস্থা নেই। কিন্তু সেই মানুষগুলোর ওপর তার আস্থা আছে, যাদের মধ্যে অন্তত তিনটি গুণ আছে। যারা সঠিকভাবে চিন্তা করতে পারে, মহান অনুভব যাদের চিত্তে সবসময় থাকে এবং জগৎ ও জীবনের স্বার্থে যারা সঠিক কর্ম সম্পাদন করতে পারে। এ তিনটি গুণ সম্বলিত মানুষ সমাজের জন্যে সম্পদ, দেশের জন্যে সম্পদ। অন্যথায় সে মানুষ নিজের জন্যে বোঝা, সমাজের জন্যে হুমকি, দেশের জন্যে ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ শেষ কথাটি হচ্ছে মানুষ চাই। নিজে মানুষ হলে সমাজটা মানুষ হয়, দেশও মানুষ হয়। দিনবদল হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স ৩৮ বছর পেরিয়ে গেল। স্বাধীনতা আমাদের কাছে অনেক বড় স্বপ্নের দ্যোতক ছিলো, সূচক ছিলো। সময় যত গড়িয়েছে, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এমনকি সেই ত্রিশের দশকে যখন বাংলাদেশ ভাগ হয় নি তখনই নজরুল বলে গেছেন- আমাদের বাংলাদেশ, রাজরানি এখন ভিখারিনি, কাঁদিছে বনে লুটিয়ে কেশ। কেন এ অবস্থা? বিভিন্ন সময় গবেষকরা নানান তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন এর কারণ হিসেবে। অথচ সহজ সত্যটি হলো আমাদের যাবতীয় সংকটের মূলে রয়েছে মানুষের মনুষ্যত্বহীনতা। গত বইমেলায় ‘মনুষ্যত্বের সংকট’ নামে আমার একটি সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যাতে বলেছি আমার চূড়ান্ত উপলব্ধ সত্যের কথা- বাংলাদেশ গড়বার জন্যে মানুষ চাই, যে মানুষের এখন বড় অভাব।
১৫ কোটি মানুষ আমাদের জন্যে সমস্যা নয়। সমস্যা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের জন্যে, আইএমএফ-এর জন্যে। আমার দেশের সবচেয়ে বড় সংকট যেমন মনুষ্যত্বহীনতা, তেমনি আমার দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষকে মানুষ করে গড়ে তোলা। এই ১৫ কোটি মানুষের ৩০ কোটি হাত আছে, ১৫ কোটি মন আছে, ১৫ কোটি মস্তিষ্ক আছে। এগুলো যদি কাজে লাগানো যায়, তাহলে এই দেশ বিশ্বের বিস্ময় হতে পারে। আর গুরুজীর নেতৃত্বে ফাউন্ডেশন সে কাজটিই করছে। গুরুজী একসময় হাতের রেখা ধরে আমাদের ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ তৈরি করে দিতেন। সেই সুবাদে তার সঙ্গে আমার সখ্য, ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু তিনি নিজের মতো বদলে গেলেন একদিন। তিনি দেখলেন মানুষের এই রোডম্যাপ তো মানুষ নিজেই তৈরি করতে পারে, যদি মানুষ ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে।
সে-ই মানুষ- যে মানুষের মন আছে, যে মনে নেতিবাচক চিন্তা নেই, আছে কল্যাণ ভাবনা, আছে সৃষ্টিশীল প্রণোদনা, আছে চেতনা। জাগতিক হতাশা-ব্যর্থতা এবং বিপন্ন বিষণ্নতায়ও যে মানুষ নিজের মধ্যে স্থিতধী, সে মানুষ আমাদের জন্যে সম্পদ। গুরুজী এই সম্পদ সৃষ্টির কাজে লেগে গেলেন এবং আমি দেখছি ক্রমেই তিনি বিস্তৃত হচ্ছেন, সমপ্রসারিত হচ্ছেন গভীর শিকড় নিয়ে। তিনি তার শক্তিকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সারাদেশে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস কোয়ান্টামই একদিন এই বাংলাদেশের দিনবদলের অনুঘটক হবে। হয়েছেও ইতোমধ্যে। কারণ রাজনীতি নয়, এখানে কোয়ান্টামের মতো উদ্যোগগুলোই দিনবদল ঘটাবে বলে আমি বিশ্বাস করি ।
কোয়ান্টাম শুধু তার ব্যাপ্তিই বাড়ায় নি, শুধু কোয়ান্টিফাই-ই করে নি, করেছে কোয়ালিফাই। অর্থাৎ গুণগত মান বাড়াবার কাজ। মানুষকে মানুষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার কাজ। একজন মানুষ তার শারীরিক-মানসিক প্রতিবন্ধকতাকে ধ্যান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, ইতিবাচক শক্তির মাধ্যমে কীভাবে জয় করবে- শিখিয়েছে সে প্রক্রিয়া।
আত্মবিশ্বাস, ইতিবাচকতা যে একজন মানুষের বাস্তবতাকে কীভাবে বদলে দেয় তার একটা উদাহরণ দেয়া যাক। একটু বয়স হয়ে গেলেই আমরা বলতে থাকি- বয়স বাড়ছে, এখন আর আগের মতো মনে থাকে না কিছুই। তার মানে আপনি নিজেই নিজেকে বৃদ্ধ করছেন। আপনার শরীরের যন্ত্রগুলোকে আপনি দুর্বল করে দিচ্ছেন।
বিজ্ঞান বলে, ২৮ বছর বয়স থেকে আমরা শারীরিক নিয়মেই স্মৃতিশক্তি হারাতে থাকি আর ৫৮-এর মধ্যে স্মৃতিশক্তির জীবন শেষ হয়ে যায়। ৫৮-এর পর থেকে বার্ধক্যের লক্ষণগুলো ফুটে উঠতে থাকে। প্রায়ই তার ভুলে যাওয়ার প্রবণতা হতে থাকে।
কিন্তু একজন সচেতন মানুষ বা আত্মশক্তিসমৃদ্ধ মানুষের ক্ষেত্রে তা ঘটে না। তার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের আরেকটি সূত্র তখন সক্রিয় হয়। তাহলো, ৫৮-এর পরে একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষের সেকেন্ডারি মেমোরি গড়ে ওঠে, যিনি তার স্মৃতিকে কর্মক্ষম রাখার জন্যে ভালো কাজে, নতুন নতুন দক্ষতা শেখার কাজে ব্যবহার করেছেন এবং পজিটিভ অটোসাজেশন দিয়েছেন। অন্যদিকে যারা নেতিবাচক চিন্তায় বেশি সময় ব্যয় করে তাদের স্মৃতিশক্তি সবচেয়ে দুর্বল থাকে। পিকাসো তো জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। ৯৮ বছর বয়সেও সন্তানের জনক হয়েছিলেন। কাজেই মানুষের মধ্যে অসাধ্য সাধনের ক্ষমতা আছে। এই ক্ষমতাগুলোই জাগিয়ে তুলছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন।
ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র বলতেন, ‘তোমরা যেমন মাছের চাষ কর, তেমনি তোমরা মানুষের চাষ কর।’ মানুষের চাষ হচ্ছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে। আসুন এই চাষ-বাসে একটু সার দেই- আমাদের ফলগুলো যেন বেশ জীবন্ত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষগুলো যেন মনুষ্যত্বের ঠিকানা খুঁজে পায় এই ফাউন্ডেশনে।
১৯৯৩ সালে পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে কোয়ান্টামের যাত্রা শুরু হয়েছিলো। আমার সৌভাগ্য যে, সেদিন আমি ছিলাম। তখন ছিলো শীতের দিন। বেশ স্যুট, কোট-টাই পরে কেতাদুরস্ত হয়ে বক্তৃতা করেছিলাম, গরমে ঘামি নি, লোডশেডিং ছিলো না তখন। এখন এসে দেখলাম লোডশেডিং হলো, গরমে ঘামলাম, কিন্তু যা দেখলাম যা শুনলাম তাতে গরমে ঘামবার শ্রান্তিটি ভুলিয়ে দিয়েছে। আমার একান্ত কামনা এই প্রতিষ্ঠান আরো বিস্তৃত হবে। হতাশাগ্রস্ত, বিভ্রান্ত, নেতিবাচক চিন্তায় বিপন্ন এবং ধ্বংসাত্মক ভাবনায় প্রায় বিধ্বস্ত- এমন মানুষগুলোকে আবার আশাবাদের ঠিকানা চিনিয়ে দেবে এই ফাউন্ডেশন। [কোয়ান্টাম মেথড ৩০০ কোর্সপূর্তির প্রাক্কালে কোয়ান্টাম গ্রাজুয়েট শিক্ষক সমাবেশে প্রদত্ত শুভেচ্ছা বক্তব্যের অনুলিখন]