প্যালিয়েটিভ কেয়ার মূলত জীবনেরই জয়গান

মুখের ক্যান্সার নিয়ে একজন মহিলা ভর্তি হয়েছিলেন আমাদের ওয়ার্ডে। তার মুখের একপাশ জুড়ে দগদগে ঘা, ক্রমাগত পুঁজ ঝরছে। সেই সাথে তীব্র যন্ত্রণা। আমরা চিকিৎসা শুরু করলাম। পরিচর্যা আর যত্নে একসময় পুঁজ পড়া বন্ধ হলো, ব্যথাও কমলো কিছুটা। কিন্তু তিনি তখন ক্রমশ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
একদিন জানতে চাইলাম তার কাছে-‘আমরা কি আসলেই আপনার কোনো উপকার করতে পেরেছি?’ তিনি তখন তার ক্ষতবিক্ষত মুখটি নিয়ে হেসে বলেছিলেন, ‘ডাক্তার সাহেব, আপনারা নিজেরাও জানেন না আমার কত বড় উপকার আপনারা করেছেন। আমার ৫ বছরের ছোট মেয়েটা ঘায়ের দুর্গন্ধ আর ব্যথার যন্ত্রণা দেখে আগে আমার কাছেই আসতো না। আর এখন সে প্রতিদিন আমার সাথে ঘুমায়। অন্তত জীবনের শেষ দিনগুলোতে আমি ওকে বুকে নিয়ে ঘুমাতে পারছি।’ আসলে প্যালিয়েটিভ কেয়ার নিয়ে কাজ করার সার্থকতা আর তৃপ্তিটুকু এখানেই।
২০০৩ সালে আমার এক ব্রিটিশ বন্ধু আমাকে একটি বই দেন- ‘ইন্ট্রোডিউসিং প্যালিয়েটিভ কেয়ার’। আমি তখন বিএসএমএমইউ-তে এনেস্থেশিয়া বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। বইটি পড়ে আমার উপলব্ধি হলো-এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় একটি বিষয়।
গত শতাব্দীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির পরও এখনও বহু রোগ আছে যা নিরাময়-অযোগ্য। এসব রোগে আক্রান্ত মানুষের রোগ-যন্ত্রণা সাধ্যমতো প্রশমনের ব্যবস্থাটাই হলো প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা প্রশমন সেবা। আমার মনে হলো প্যালিয়েটিভ কেয়ার ছাড়া পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাটাই আসলে অপূর্ণ থেকে যায়। কারণ প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার যে পর্যায়ে রোগীর স্বজনকে বলা হয় যে, আমাদের আর কিছুই করার নেই, রোগীকে বাড়ি নিয়ে যান; ঠিক সেখান থেকেই কাজ শুরু করে প্যালিয়েটিভ কেয়ার।
আমাদের মতো দেশগুলোতে অনেক নিরাময়-যোগ্য রোগ এমনিতেই পারিবারিক সামাজিক অর্থনৈতিক নানা কারণে নিরাময়-অযোগ্য রোগে পরিণত হয়, সেই সাথে নিরাময়-অযোগ্য রোগের বোঝা তো আছেই। তখন আমার মনে হলো-আমাদের দেশে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের কাজ শুরু হওয়াটা ভীষণভাবে প্রয়োজন।
প্রশমন সেবা আসলে অত্যন্ত জীবনধর্মী একটি কাজ। কারণ মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটি রোগের যে ইতিহাস আমাদের বলেন, তা মূলত তার পুরো জীবন কাহিনীই বলা চলে, যাতে তার শারীরিক মানসিক আত্মিক ও সামাজিক- জীবনের চতুর্মাত্রিক রূপটি প্রতিফলিত হয়। তাই আমরা বলি-মৃত্যুর সাথে নয়, আপনি যদি জীবনের সাথে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের যোগসূত্র স্থাপন করতে পারেন, তবেই আপনি এখান থেকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে পারবেন। কারণ মানুষটি তো এখনও বেঁচে আছে। তাই প্যালিয়েটিভ কেয়ার আসলে জীবনেরই একটি অংশ। এটি মূলত জীবনেরই জয়গান।
আর এসব রোগীকে পরিপূর্ণ সেবা দিতে চাইলে তার সাথে চিকিৎসক ও নার্সদের একটি মমতাপূর্ণ যোগাযোগ স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। এ প্রসঙ্গে মাদার তেরেসার একটি কথা আমাদের প্রেরণা যোগায়-We cannot always do the great things, but we can do small things with great love.
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে এরকম একটি কাজ করতে গিয়ে পদে পদে বাধা আসে, হয়তো বাস্তব কারণেই তা কিছুটা স্বাভাবিকও বটে। কিন্তু আমি মনে করি, মানুষের সবচাইতে বড় বাধাটা থাকে তার নিজের মধ্যেই। নিজের ভেতরের সংশয় সংস্কার দ্বিধা এগুলো যতদিন থাকে ততদিন মানুষ বাধা উপলব্ধি করে। হয়তো আমার মধ্যেও এগুলো কিছুটা ছিলো বলেই প্রথমদিকে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিলাম। কিন্তু একসময় যখন এ কাজটির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেছি, তখন বাধাগুলোও যেন ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগলো।
তবে আমাদের সামনে এখনও অনেক কাজ বাকি। বাংলাদেশের প্রান্তিক এলাকার কিংবা চরাঞ্চলের নিরাময়-অযোগ্য রোগে আক্রান্ত মানুষটিকেও যেদিন আমরা প্রশমন সেবার আওতায় আনতে পারবো সেদিন কিছুটা কাজ হয়েছে বলে ভাবতে পারবো। এটি খুবই সম্ভব, কারণ এ দেশের মানুষের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো-কোনো একটি কাজকে তারা যখন ভালো কাজ মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে, এটি আমারও কাজ, তখন তার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি সময়ের ব্যাপার মাত্র।
মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর একজন মানুষের কষ্টের কতটুকুই বা উপশম করতে পারে ট্যাবলেট বা ইঞ্জেকশন? মানুষের ভেতরকার যে বিশাল শক্তি তা সঙ্ঘবদ্ধ করে একে অপরের পাশে এসে দাড়ানো, কষ্টকে লাঘব করা এবং একটি সুন্দর সমাজ গড়া- এই মানবিক বোধগুলোকে পরিশীলিত করার উদ্দেশ্যেই কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন কাজ করে যাচ্ছে।
কিছুদিন আগে লামায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো। তা ছিলো আমার জন্যে এক বিশাল অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণা। আমাদের ২/১ সন্তানের পরিবারকেই ছন্দোবদ্ধ রাখতে আমরা হিমশিম খাই, আর সেখানে ৫শ শিশুর একটি পরিবার অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সদস্য হিসেবে আমিও নিজেকে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অংশ ভেবে গর্ববোধ করি। আসলে গুরুজীর সার্থকতাটুকু এখানেই-তিনি সবাইকে নিয়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন যা আমি আমার নিজের বলেও ভাবতে পারি এবং বলতে পারি-কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আমারও প্রতিষ্ঠান।