একটি মুহূর্তও যেন অযথা ব্যয়িত না হয়

Bangla
মুস্তাফা জামান আব্বাসী

বাংলা লোকসাহিত্যের পুরোধা পুরুষ জনাব মুস্তাফা জামান আব্বাসী। সঙ্গীত ও গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই ভাটিয়ালি, জারি, সারি, দেহতত্ত্ব, ভাওয়াইয়া, মারফতি, মুর্শিদি ইত্যাদি বাংলা প্রাচীন লোকগীতি তিনি নিজে পরিবেশন করার পাশাপাশি তার পরিচালনায় জনপ্রিয় ভরা নদীর বাঁকে, লৌকিক বাংলা, আমার ঠিকানা প্রভৃতি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে লোকসঙ্গীতকে ব্যাপকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বাংলা লোকসঙ্গীতকে পরিচিত প্রশংসিত করেছেন। গত ২৫ জুলাই, বুধবার কোয়ান্টাম মুক্ত আলোচনায় তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হন। পরবর্তীতে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের প্রতি গভীর আগ্রহের প্রেক্ষিতে গত ১০ আগস্ট থেকে অনুষ্ঠিত কোয়ান্টাম মেথডের ২৫৫তম ব্যাচে অংশ নেন।

বাবা চেয়েছিলেন আমি সিনেমার ওপর পড়াশোনা করবো, অভিনয় করবো, ছবি তৈরি করবো। বাবা আরো বলেছিলেন, যা-ই হওনা কেন তুমি যেন আব্বাস উদ্দিনের ছেলে হও, সত্যিকার একজন ভালো মানুষ হও। ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা সবসময়ই ছিলো, হতে পেরেছি কিনা সে বিচার স্রষ্টা করবেন। তবে আমি নিশ্চয়ই আব্বাস উদ্দিনের ছেলে। তার চেয়েও বড় পরিচয় যে- আমি নিজেকে অন্বেষণ করেছি।

আমার স্মৃতির ভাণ্ডারে অসংখ্য চমৎকার দৃশ্যের একটি হলো, বাবা নামাজ পড়াচ্ছেন, পেছনে আমরা ৩ ভাই-বোন- এটি ছিলো আমাদের নামাজের পাঠ। বাবা আমাদের কখনো নামাজ পড়তে বলেন নি। কিন্তু নামাজের প্রতি আমাদের ভালবাসা তৈরি হওয়ার সুযোগ তিনি করে দিয়েছিলেন। আব্বা যখন নামাজ পড়তেন তখন এটা দেখার ব্যাপার ছিলো। এটা ছিলো একজন সমর্পিত মানুষের পরিপূর্ণ নিবেদন, ছিলো সত্যিকারের সিজদা। সুললিত কণ্ঠে তেলাওয়াত, অত্যন্ত পরিশীলিত, আর্টিস্টিক। রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকে দেখেছি স্রষ্টার সান্নিধ্যে তার সময় কেটেছে। আসলে কারো সাথে যদি সম্পর্ক করতে ইচ্ছা করে, সে প্রেমিক/প্রেমিকা হোক, বস হোক বা স্রষ্টা, আপনার মস্তিষ্ককে জানাতে হবে- আমি এ সম্পর্ক চাই। সংযোগ স্থাপনের জন্যে আত্মনিয়োগ করতে হবে। না হলে সবই পণ্ডশ্রম। রবীন্দ্রনাথ ভোর চারটায় প্রার্থনা ঘরে যেতেন। তাঁর কাব্য-সাহিত্যেও এই অন্বেষা ছিলো।

একদিন আজিমপুর দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ গান ভেসে এলো- ‘ওকি একবার আসিয়া, সোনার চাঁদ মোর যাও দেখিয়ারে’- ড্রাইভারকে বললাম, আজিমপুর নিয়ে চলো। সেখানে গিয়ে বললাম, বাবা তুমি ডেকেছিলে না, আমি এসেছি। আমি কখনো আমার বাবাকে ছাড়ি নি। আমার সবসময় মনে হয়, তিনি আমার সঙ্গে আছেন। মাঝে মাঝে গান এত ভালো হয়!- বলেন অনেকেই। আমি কখনো কাউকে বলি নি, গানতো আমি গাই নি, আমার মধ্য দিয়ে আমার বাবা গাইছিলেন। মায়ের সঙ্গেও আমার এমনই সম্পর্ক। ‘মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে’। যে মাকে ভালবাসে না, সে মাতৃভূমিকে ভালবাসে না। যে মাকে যত্ন করতে পারে নি তার সব মিথ্যা। কী হবে তার হজে গিয়ে, কী হবে এত পড়াশোনা করে?
বাবা একদিন নজরুলের বাড়িতে ছিলেন। দুপুরের খাওয়া তখনও হয় নি। তিনি বললেন, কাজীদা একটা জায়নামাজ পাওয়া যাবে? আমি জোহরের নামাজ পড়বো। কাজীদা জায়নামাজ বিছিয়ে দিয়ে গানটি লিখলেন- ‘হে নামাজী, আমার ঘরে নামাজ পড়ো আজ।’ এ গানগুলোর মধ্য দিয়ে বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস কথা বলবে।যারা গবেষণা করবেন, ভালবাসবেন বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করবেন তখন দেখবেন এগুলোর মধ্যে অনেক কিছু লুকিয়ে আছে।

মদীনায় যাওয়ার সুযোগ হলো। খুব ইচ্ছে হলো নবীজীকে (স.) আমার গান শোনাই। তাঁকে বললাম, ‘তুমি তো আমাকে ভালবাসো। আমার পিতা আব্বাস উদ্দিন ৪০০টি হামদ্‌/নাত গেয়ে সমস্ত বাংলার অবহেলিত কৃষক মুসলিম ভাইদের জাগিয়েছে, আমার পিতার বন্ধু কাজী নজরুল ইসলাম হাজার হাজার গান লিখে মুসলমানদের অন্তরে রাসূলের প্রতি মোহাব্বত, আল্লাহর প্রতি ঈমান বাড়িয়ে দিয়েছে। পিতার বন্ধু গোলাম মোস্তফা যিনি ‘বিশ্বনবী’ লিখেছিলেন, তারা কেউ-ই এখানে আসতে পারেন নি। তুমি কি তাদেরকে ভালবাসো না? তাহলে তুমি যেখানে ঘুমিয়ে আছো, ঠিক তার পাশে আমাকে বসতে দাও। তিনি আমার কথা শুনলেন। সুযোগ পেয়ে একটার পর একটা গান তাঁকে শুনিয়েছি- ‘আমার মুহাম্মদের নামের ধেয়ান, হৃদয়ে যার রয়’- আমার চোখে পানি। আমি উপলব্ধি করেছি তাঁকে- এটাই তো গান।

স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষাজীবনে যত পাঠ্যবই ছিলো নবীর জীবনের ওপর কখনো কিছু পাই নি। তাহলে আমাদের মানুষের তাহলে কীভাবে নবীর সাথে পরিচয় ঘটবে? এতে করে নবীর সাথে সমাজের সম্পর্ক হবে ১ দিনের, মিলাদুন্নবীর দিন টেলিভিশনে একটা মোনাজাতের মাধ্যমে- এটা কি যথেষ্ট? নবীর সাথে আমাদের সম্পর্ক হতে হবে ৩৬৫ দিনের।

একসময় সুযোগ হলো এ লক্ষ্যে কাজ করার। সে সময় আমি আমেরিকাতে। মুহাম্মদ (স.)-এর ওপর ২০০ বই পেলাম লাইব্রেরিতে। শুরু হলো লেখা। লেখার সময় এমন এক অদ্ভুত ভালোবাসায় মন ভরে উঠলো যে, আমি এক পাতা লিখছি আর চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছে। সাধারণ তরুণদের মনের জিজ্ঞাসা আমার মনের মধ্যে নিয়ে আমি তাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছি বইটিতে। বইটি যখন বেরোয়, প্রকাশক সন্দেহ প্রকাশ করলেন বিক্রির ব্যাপারে। আমি আল্লাহকে বললাম, হে আল্লাহ! মার্কেটিং সম্পর্কে তোমার তো অভিজ্ঞতা আছে! তাহলে তুমি এ দায়িত্ব নাও! অবিশ্বাস্য ভাবে মাত্র ৩ মাসের মধ্যেই ১ম সংস্করণ শেষ হলো। দ্বিতীয় সংস্করণের অভিজ্ঞতাও একই রকম। আসলে বিশ্বাস করলে এরকমই হয়। যেকোনো কাজ আমরা যদি বিশুদ্ধ নিয়তে করি, অন্তর থেকে বলি, তাহলে আমাদের প্রভু- যিনি সবসময় আমাদের সঙ্গে আছেন, তাকে যা কিছু বলবো তিনি তা শুনবেন, সাহায্য করবেন।

এ বছরকে প্রখ্যাত সুফি সাধক মাওলানা জালালুদ্দিন রূমীর স্মরণে ‘ইয়ার অফ দ্য রূমী’ ঘোষণা করা হয়েছে। এ উপলক্ষে গত মে মাসে ইস্তাম্বুলে রূমীর ওপর সেমিনারে একটা অভিসন্দর্ভ উপস্থাপনের সুযোগ হয়েছিলো। রূমী এমন একজন মানুষ, এমন একজন কবি যিনি সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে ভ্রাতৃভাবে গ্রহণ করেছেন। সব ধর্মবিশ্বাসকে তিনি সম্মান করেছেন। তিনি বলেছেন, মানবমণ্ডলী এক জাতি, আল্লাহ যেকোনো মানুষের তওবা কবুল করবেন। পাশ্চাত্যে এখন ইংরেজ লেখকদের তুলনায় রূমীর বইয়ের পাঠক সংখ্যা বেশি। এখন অনেকে বলে, মুসলমানরা নাকি যুদ্ধংদেহী। তারাই যখন রূমীর কবিতায় আকৃষ্ট হয়, তারা দেখে মুসলমানদের অন্তরে প্রবাহিত মমতার ফল্গুধারা।

আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি সেখানে চর্মচক্ষুতে দেখার বাইরেও আর এক ধরনের দেখা আছে, সেটি হলো মনের দেখা। যে মনটাকে যত ওপরের দিকে নিতে পারবে, সে তত বেশি কিছু দেখতে পারবে। এটা খুব গোপন জগত, এই গোপন জগতে যারা যেতে চান তাদের আলাদা চলা-বলা, আলাদা সঙ্গীত, আলাদা জিকির। পৃথিবী থেকে অনেকখানি গুটিয়ে নেন তারা নিজেদেরকে। এই সূক্ষ্ম জগতে সর্বক্ষণের যার উপস্থিতি তিনি প্রভু দয়াময়, পরম যিনি লব্ধ তাকে প্রতিটি মুহূর্ত উপলব্ধি করাই তাকওয়ার মূল কথা। এটা হলো তাকওয়ার পরিচ্ছদ, এই পরিচ্ছদটা যিনি পড়েছেন তিনি অম্লান নির্মল ব্যক্তিত্বে পরিণত হবেন।

আমি অত্যন্ত সাধারণ নাগরিক এবং এ হিসেবে আমি দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত আছি। আমি গ্রামে গ্রামে গিয়েছি, মানুষের সঙ্গে কাজ করেছি যতটুকু সম্ভব। তরুণদের জন্যে আমার একটাই বক্তব্য। তাদের একটা মুহূর্তও যেন অযথা ব্যয়িত না হয়। যারা আমার বয়সী তাদের বলবো, এ জীবনের জন্যে অনেক সময় দিয়েছি। এখন যে জীবন আমাদের হাতছানি দিচ্ছে তার জন্যে বেশি কাজ করা প্রয়োজন। সেটা শুধু নিজের জন্যে নয়। সৃষ্টির সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে, সর্বোপরি মমতা আর ভালবাসায় ভরিয়ে দিতে হবে পৃথিবীটাকে।