আত্মার মুক্তি ও জগতের কল্যাণই ধ্যানের লক্ষ্য

মানব সভ্যতার ইতিহাসে কবে, কখন প্রথম যোগানুশীলনের পদ্ধতি আবিষ্কৃত ও অনুশীলিত হয়েছে তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যায় নি। আদিম যুগ থেকেই মানুষের চিরন্তন বাসনা ছিলো সুস্থ দেহে সম্পদ ও আনন্দের অধিকারী হওয়া। কিন্তু মানবদেহের যা গঠন পদ্ধতি তাতে রোগ-ব্যাধি এতে আশ্রয় নেয়। দুঃখ-বেদনা-বিষাদ মনের আনন্দকে ক্ষয় করে, জীবনের প্রতি আগ্রহ-উৎসাহ হ্রাস করে। এ শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভের ইচ্ছায় ঋষিরা যে যোগপদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন তা অনুশীলন করে মানুষ নীরোগ দেহে, প্রশান্ত মনে অবস্থান করার সৌভাগ্য লাভ করেছে।
যোগদর্শনের অষ্টাঙ্গ পদ্ধতি হলো- যম নিয়ম আসন প্রাণায়াম প্রত্যাহার ধারণা ধ্যান ও সমাধি। এই অষ্টাঙ্গ যোগ অনুশীলনের মধ্য দিয়ে মানুষ মুক্তি বা মোক্ষলাভে সমর্থ হয়ে থাকে।
যম বলতে সংযমকেই বোঝানো হয়ে থাকে। এর অঙ্গ হিসেবে এসেছে অহিংসা, সত্য, অস্ত্যেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ। অর্থাৎ দেহ মন ও বাক্য দ্বারা আহত বা ব্যথা না দেয়া। সত্যনিষ্ঠ থাকা, কথায় ও কাজে মিল রাখা। অপরের জিনিস চুরি না করা। দৈহিক সংযম এবং বিনা প্রয়োজনে অপরের কোনো দ্রব্য গ্রহণ না করা। দ্বিতীয় অঙ্গ নিয়মের মধ্যে রয়েছে শৌচ অর্থাৎ পবিত্রতা, সন্তোষ, তুষ্টি অনুভব, তপস্যা, সাধনা এবং সর্বক্ষণ স্রষ্টার স্মরণ।
যোগসাধনায় দেহকে সুস্থ এবং মনকে স্থির রাখার জন্যে রয়েছে পদ্মাসন, ধ্যানাসন, সহজাসনসহ বিভিন্ন আসন। প্রাণায়াম যোগসাধনার স্তরগুলোর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণায়ামে হৃদযন্ত্র সক্রিয় থাকে, মনোযোগ বাড়ে।
প্রত্যাহার বহির্মুখী ইন্দ্রিয়গুলোকে অন্তর্মুখী করার প্রচেষ্টার নাম। কারণ ইন্দ্রিয়গুলো অন্তর্মুখী হলে মনে স্থিরতা আসে, আরাধ্য বস্তুতে মন নিবিষ্ট হয়। আর মনকে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে স্থির বা সংযত রাখার নাম ধারণা। দীর্ঘ অনুশীলনে লক্ষ্যবস্তুতে মন নিবিষ্ট হওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে। যে বিষয়ে মনকে নিবিষ্ট করা হয়েছে সে বিষয়ে অবিচ্ছিন্ন ভাবনাকে ধ্যান বলে।
যোগসাধনার সর্বোচ্চ স্তর সমাধি লাভ। সমাধিতেই সবকিছু সম্পূর্ণরূপে লীন হয়ে যায়। ধ্যানের ক্ষেত্রে সাধক একটি ভাবনা বা বিষয়েই চিন্তা করেন, কিন্তু সমাধির ক্ষেত্রে এই ভাবটি লুপ্ত হয়ে যায়। এ অবস্থায় ধ্যানী, ধ্যেয় বস্তু এবং ধ্যানপ্রক্রিয়া- সব একাকার হয়ে যায়। যোগানুশীলনের এ সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগী সমাধিস্থ হন। সংক্ষেপে এই হলো প্রাচীন যোগশাস্ত্রে অনুমোদিত যোগসাধনা।
যুগোপযোগী করে যোগসাধনার প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা সাধারণ মানুষের মাঝে গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। তাই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে আমরা যে আধুনিক যোগসাধনার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করছি তার মধ্যে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কোয়ান্টাম মেথড সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য।
ছাত্রজীবন থেকেই সনাতন ধর্মের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ শ্রী গীতার প্রতি আকৃষ্ট হই। এ গ্রন্থের মহান বাণী তখন আমাকে আলোড়িত করেছে, কৌতূহল বাড়িয়েছে। শিক্ষক জীবনে প্রবেশ করে কৌতূহল আরো বাড়তে থাকে। একসময় কোয়ান্টাম মেথডের নাম শুনে ভাবলাম, গিয়ে দেখি কী হয়। জানার আগ্রহে মুক্ত মন নিয়ে কোর্সে অংশগ্রহণ করলাম এবং খুঁজে পেলাম দীর্ঘদিনের কৌতূহল মেটানোর পন্থা। ভারতীয় দর্শনে ‘যোগ’ এর কথা বার বার এসেছে। সে তত্ত্বকে বাস্তব অভিজ্ঞতায় আনার সুযোগ পেলাম এতে।
কোয়ান্টাম মেথড নামকরণের মধ্যেই বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাচীন যুগের চিরায়ত যোগসাধনা ও বিজ্ঞানের এক চমৎকার সংমিশ্রণের ফলে কোয়ান্টাম এখন আধুনিক মানুষের জীবনে একাকার হয়ে গিয়েছে। সংস্কৃত ভাষার ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে সনাতন ধর্মের তাত্ত্বিক দিক সম্পর্কে যতটা জেনেছি সে আলোকে বলা যায়, ধর্মীয় বাণী ও কোয়ান্টাম মেথড পরস্পর সম্পূরক। যিনি যে ধর্মের পথে আছেন, মেডিটেশনের মাধ্যমে তার সেই ধর্ম পালন আরো সুন্দর হবে, সহজ হবে।
প্রাচীন যুগের যোগসাধনায় পার্থিব জীবনের চেয়ে পারমার্থিক কল্যাণ ছিলো প্রধান। কিন্তু ‘আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’ অর্থাৎ আত্মার মুক্তি এবং জগতের কল্যাণ এই দুই-ই সাধন জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত- স্বামী বিবেকানন্দের এ অমর বাণীর বাস্তব রূপায়ণ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মধ্যেও ঠিক যেন এ নীতিরই প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। কোয়ান্টামে রয়েছে স্রষ্টার করুণার প্রতি গভীর বিশ্বাস রেখে নিজের শক্তি-সম্ভাবনার অনুসন্ধান এবং তারপর তা জাগতিক ও পারমার্থিক উভয় কল্যাণের কাজে নিয়োগ করা।
১৭ বছরের কর্মপ্রবাহে গুরুজী ৩০০ তম কোর্স অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করে মেডিটেশন জগতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সমাজের বিভিন্ন মহলের বিভিন্ন পেশার, ধর্মের ও মতের হাজার হাজার নারী-পুরুষ, কিশোর-বৃদ্ধ কোয়ান্টামের প্রদর্শিত সাধনরীতি অনুসরণ করে আলোকিত জীবনের পথে পথিক হয়েছেন। কোয়ান্টাম অনুশীলন করে শিক্ষার্থী পেয়েছে অভীষ্ট সাফল্য। পরিবারে এসেছে শান্তি। পেশাজীবী পেয়েছেন বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সফলতা লাভের দিক-নির্দেশনা। কোয়ান্টাম কোর্স করে নিয়মিত ধ্যান অনুশীলন করেছেন এমন ব্যক্তির আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা, কর্মপ্রচেষ্টায় মুগ্ধ হয়ে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্য, বন্ধুবান্ধব, নিকটাত্মীয়রা আজ কোয়ান্টামমুখী হয়ে উন্নততর জীবনের পথে অগ্রসর হচ্ছেন।
আত্ম উন্নয়নের পাশাপাশি কোয়ান্টাম উদ্বুদ্ধ করছে শ্রমানন্দে অসহায় মানুষের দিকে করসেবার হাত বাড়িয়ে দিতে। কোয়ান্টামে রয়েছে নিজের ও অন্যের নিরাময়ের জন্যে বিশেষ শিক্ষা, মুমূর্ষুকে সুস্থ করার প্রয়াসে স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম, সমাজে দরিদ্র-নিপীড়িত, অসহায় শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থাসহ বহুমুখী সেবা কার্যক্রম। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তরুণ প্রজন্মকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সমাজে বিপথগামী হওয়ার বহু উপকরণের মাঝেও এখন কোয়ান্টাম মেথডের মাধ্যমে তরুণরা নিজেদের আত্মিক উন্নয়নের সাথে সাথে মানব সেবায় অংশগ্রহণ করতে পারছে। আমার বিশ্বাস ভবিষ্যতে এরাই হবে একেকটি অনন্য মানুষ।